নৌপথে ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে যেসব প্রস্তুতি সরকারের 

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ , ১১:৪১ এএম


নৌপথে ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে যেসব প্রস্তুতি সরকারের 
সদরঘাটের পুরনো ছবি

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের নৌপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সুশৃঙ্খল যাতায়াত নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সদরঘাটকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা ও নৌপথে দুর্ঘটনা এড়াতে এবার নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কঠোর ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে নৌপথে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, যাত্রীসেবা, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ফেরিঘাট ব্যবস্থাপনা এবং নৌযান চলাচলে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে ওই সভায় প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া উপস্থিত ছিলেন।

ঈদযাত্রা নিয়ে প্রস্তুতি সভায় নৌপরিবহনমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, লঞ্চ মালিক, শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এবারের ঈদে নৌপথে যাত্রীরা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাবেন।

শেখ রবিউল আলম বলেন, এবারের লক্ষ্য হচ্ছে নৌপথে এমন একটি ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা, যাতে যাত্রীরা আরামদায়ক, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারে।

তিনি বলেন, গত ঈদে দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে নৌযাত্রা শান্তিপূর্ণ ছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।

থাকবে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সদরঘাটে বিভিন্ন সংস্থার আলাদা আলাদা কন্ট্রোল রুম না রেখে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), নৌপরিবহন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একটি মাত্র ‘কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’ পরিচালিত হবে।

এ ছাড়া সদরঘাটের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।

প্রতি লঞ্চে ন্যূনতম ৪ জন আনসার 
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঈদের আগে ১৯ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে ন্যূনতম চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব হবে নদীপথে ট্রলার বা নৌকা ভিড়িয়ে অবৈধভাবে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করা এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ছাদে যাত্রী ওঠানো ও অতিরিক্ত মালামাল পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে রুট পারমিট বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নদীতে ট্রলার-নৌকায় যাত্রী ওঠানামা নিষিদ্ধ
সভায় কঠোরভাবে জানানো হয়, কোনো অবস্থাতেই নদীর মাঝপথে ট্রলার বা নৌকার মাধ্যমে যাত্রী লঞ্চে ওঠানামা করতে পারবে না। নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড দিনরাত টহলের মাধ্যমে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। সদরঘাট এলাকায় নির্ধারিত ট্রলারঘাট ছাড়া অন্য কোথাও যাত্রী ওঠানো-নামানো যাবে না।

ঈদে ১০ দিন বন্ধ থাকবে বাল্কহেড চলাচল
নৌদুর্ঘটনা রোধে ঈদের আগে ও পরে মোট ১০ দিন সারাদেশে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত দিনে-রাতে কোনো বাল্কহেড চলতে পারবে না। একইসঙ্গে সদরঘাট থেকে ডিঙ্গি নৌকার চলাচলও বন্ধ থাকবে।

বসিলা ও শিমুলিয়া ঘাটে বাড়ছে লঞ্চসেবা
সদরঘাটে যাত্রীচাপ কমাতে এবারও মোহাম্মদপুরের বসিলা ব্রিজসংলগ্ন ঘাট এবং পূর্বাচলের কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল করবে।

শিমুলিয়া ঘাটে যাত্রীদের জন্য বিআরটিসি’র শাটল বাস চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বসিলা ঘাটে নতুন পন্টুন স্থাপন এবং দুই ঘাটেই টয়লেট, বিশ্রামাগার, ট্রলি ও হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হবে।

এ ছাড়া বরিশাল, ভোলা, হাতিয়া, বেতুয়া ও চাঁদপুর রুটের কিছু লঞ্চ বসিলা ও শিমুলিয়া থেকে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, ঈদ উপলক্ষে নৌপথে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকার প্রধান নৌবন্দর সদরঘাট ছাড়াও শিমুলিয়া এবং বসিলা থেকেও যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সদরঘাট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত যানজটমুক্ত রাখার নির্দেশ
২১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাস্তার দুইপাশ হকারমুক্ত রাখা, এলোমেলো যানবাহন অপসারণ এবং প্রয়োজন হলে ওয়ানওয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থা চালুর কথাও সভায় বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর ঢাকা নদীবন্দরের (সদরঘাট) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্মপরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ঈদযাত্রা উপলক্ষে আমরা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি ও গোছানো প্রস্তুতি নিয়েছি। নির্বিঘ্ন নৌযাত্রা উপহার দিতে আমরা সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। সদরঘাটে যাত্রীদের সেবায় ফ্রি কুলি ও ট্রলি সার্ভিস রাখার কথাও জানিয়েছেন এ কর্মকর্তা।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কড়া নজরদারি
সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সকল ঘাট ও লঞ্চে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে রাখতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

মালিক সমিতিকে ঈদের সময়ও পুনঃনির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০ শতাংশ কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

নিরাপত্তা জোরদারে টহল ও ভিজিল্যান্স টিম
নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল-ভোলা রুটসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে রাতের টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি ঘাট এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও সার্বিক পরিস্থিতি তদারকিতে বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম গঠন করবে।

যাত্রীসেবায় বাড়তি উদ্যোগ
প্রতিটি লঞ্চে ডিজিটাল ডিসপ্লে স্ক্রিনে ভাড়া ও জরুরি হটলাইন নম্বর প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাত্রীদের জন্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, ফায়ার সার্ভিস ১০২, বিআইডব্লিউটিএ হটলাইন ১৬১১৩ এবং কোস্টগার্ড হটলাইন ১৬১১১ নম্বর ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে।

এ ছাড়া নারী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, বিশুদ্ধ পানি, মোবাইল চার্জিং ও উন্নত টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, সদরঘাটে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে ট্রলির ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ট্রলির জন্য কাউকে কোন টাকা দিতে হবে না।

সদরঘাটে হকার এবং কুলিদের উৎপাত বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, স্পিডবোট বা নৌকা দিয়ে লঞ্চে কোনো যাত্রী উঠতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার না হয় সেজন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সদরঘাটে নৌ বন্দরের দুই পাশে আলাদা সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে ছোট ছোট নৌকা বা স্পিড বোড থেকে যাত্রীরা সহজেই ঘাটে উঠতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত টহলও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

নৌপথে কোরবানির পশু পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত, ফেরিঘাটে অতিরিক্ত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, স্পিডবোটে লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কঠোরভাবে আবহাওয়া সংকেত অনুসরণের নির্দেশনাও দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

সূত্র: বাসস

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission