দেশের কারাগার গুলোকে উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক ও যুগপযোগী করে বন্দিদের মাঝে স্বস্তি ফেরাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।
যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন, বন্দিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও খেলাধুলার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ধরণের বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি।
এছাড়া, বন্দিদের জন্য নতুন কারাগার নির্মাণ ও পুরাতন কারাগারগুলোর পরিবেশ উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, আমাদের কারাগারের বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করতে মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। আইনটি অনুমোদন হলে বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের উদ্যোগে কারাগারগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরণের সংশোধন, উন্নয়ন ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাও একসময় বিশ্বের অন্যান্য উন্নত কারা ব্যবস্থার সঙ্গে মানবাধিকার ও সংশোধনমূলক কার্যক্রমে সমান অবস্থানে পৌঁছাবে।
তিনি আরও জানান, বন্দিদের পুষ্টির মান বাড়াতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ ও মাংসের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। আগে বন্দিদের খাবারে দৈনিক প্রোটিনের পরিমাণ ছিল ৩৬ গ্রাম। বর্তমানে তা ৫৪ গ্রামে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। তাই এটিকে ১০০ গ্রামে উন্নীত করার প্রস্তাবও সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়াও কারাগারে চিকিৎসকের সংকট কাটাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে চিকিৎসক আনা এবং নিজস্ব উদ্যোগে চিকিৎসক নিয়োগের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স সংকট দূর করতে ৭২টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। আশা করছি আগামী অর্থবছরে প্রকল্পটির কাজ আমরা এগিয়ে নিতে পারব। এটি বাস্তবায়িত হলে বন্দিদের দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্দিদের মানসিক স্বস্তির জন্য বড় উৎসবগুলোতে কারাগারে তাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। কারাগারে বন্দিদের মধ্যে অনেকে শিল্পী রয়েছেন তাদেরকে নিয়ে একটা দল গঠন করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন কারাগারে গিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এছাড়াও কারাগারে বন্দিদের আয়ের সুযোগ তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ শেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করতে পারবে।
কারা অধিদপ্তর জানায়, বন্দিদের জন্য মাসে ১৭ দিন সকালে রুটি, সবজি ও হালুয়া দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলোতে দেওয়া হয় খিচুড়ি। দুপুরে ভাতের সঙ্গে মাছ বা মাংস, ডাল ও সবজি এবং রাতে ভাতের সঙ্গে ডাল ও সবজি পরিবেশন করা হয়।
পবিত্র ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও জাতীয় দিবসে কম অপরাধে দণ্ডিত বন্দিদের সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি দেওয়া হয়। এছাড়া রেয়াতসহ যেসব বন্দির সাজা ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে, কারাবিধি অনুযায়ী তাদের মুক্তির বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক দেওয়ান মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে ৭৪টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় ও ৫৯টি জেলা কারাগার। ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীয় ও জেলা মিলিয়ে ২০টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার অন্যতম।
বিভাগভিত্তিক কারাগারের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২০টি, ময়মনসিংহে ৪টি, রাজশাহীতে ৮টি, সিলেটে ৫টি, চট্টগ্রামে ১২টি, বরিশালে ৭টি, রংপুরে ৮টি এবং খুলনায় ১১টি কারাগার রয়েছে।
দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষের জন্য ৪১ হাজার ১৭৯ এবং নারীদের জন্য ১ হাজার ৯৭৮ জনের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৮১ হাজার বন্দি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি কারাগারে ক্যান্টিন সুবিধা চালু করা হয়েছে। ফলে বন্দিদের স্বজনরা অনলাইনের মাধ্যমে বন্দিদের পিসি অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছেন। এছাড়া দীর্ঘদিন কারাভোগ করা প্রায় ২ হাজার কয়েদিকে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তির সুযোগের আওতায় আনা হয়েছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে ১০ হাজার ৮০০ বন্দি রয়েছে। সেখানে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে ৪ হাজার ৫৯০ জনের।
তবে কারাগারের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। সেখানে রুটি তৈরির আধুনিক মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। বন্দিদের বিনোদনের জন্য ফুটবল, ভলিবল ও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও কারাগারে বন্দিদের মধ্যে যেসব শিল্পী রয়েছে তাদের নিয়ে বিভিন্ন সময় গানের অনুষ্ঠান করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দেশের অত্যাধুনিক চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে পুনর্বাসন, শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ থাকবে।
আরটিভি/এমএস/এসআর



