ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং গভীর ভালোবাসার এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই উৎসবের মূল ভিত্তি জড়িয়ে আছে ইসলামের অন্যতম মহান নবী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং তার পরিবারের এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার ইতিহাসের সাথে।
কোরবানির এই গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে।
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করে একটি সদ্বংশজাত সন্তান লাভ করেছিলেন, যার নাম হযরত ইসমাইল (আঃ)। সন্তান যখন কিশোর বয়সে পদার্পণ করলেন, তখন হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পর পর তিন রাতে স্বপ্নে দেখলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাকে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানির নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি এক মহাজাগতিক পরীক্ষা।
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তার স্বপ্নের কথা প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে জানালেন। জবাবে কিশোর ইসমাইল (আঃ) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেন: "হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।"
পিতা যখন পুত্রকে কুরবানি করার জন্য মিনার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন শয়তান তিনবার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এসে তাদের আল্লাহর আদেশ অমান্য করার জন্য প্ররোচিত করার চেষ্টা করে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এবং হযরত ইসমাইল (আঃ) প্রতিবারই শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে তাড়িয়ে দেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই আজ পর্যন্ত হজের সময় হাজিরা মিনায় পাথর নিক্ষেপ করে থাকেন।
মিনায় পৌঁছে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) যখন পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন, তখন আল্লাহ তাআলা পিতা-পুত্রের এই পরম আত্মসমর্পণ ও নিষ্ঠা কবুল করে নেন। আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাইল (আঃ) জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে আসেন এবং অলৌকিকভাবে হযরত ইসমাইলের স্থানে দুম্বাটি প্রতিস্থাপিত হয়। পুত্র ইসমাইলের পরিবর্তে দুম্বাটি কোরবানি হয়।
আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর এই ত্যাগকে এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের সমস্ত সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য এই কোরবানিকে ওয়াজিব বা আবশ্যক করে দিয়েছেন।
ইসলামে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কেবল পশু জবাই করা বা মাংস খাওয়া নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মনের ভেতরের পশুবৃত্তিকে কোরবানি দেওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওগুলোর মাংস এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।"
নিজের প্রিয় বস্তু বা অহংকারকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়ার নামই কোরবানি।
যুগ যুগ ধরে এই ঈদ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়ে আসছে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশে আজ ঈদুল আজহা পালন করা হবে। সকালে মুসল্লিরা কাছাকাছি ঈদগাহ বা মসজিদে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। খতিব নামাজের খুতবায় তুলে ধরবেন কোরবানির তাৎপর্য। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই একত্রে নামাজ আদায় ও শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে গত ২৫ মে থেকে দীর্ঘ ছুটি শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ঈদের মূল ছুটির সঙ্গে নির্বাহী আদেশে ঘোষিত অতিরিক্ত ছুটি মিলিয়ে এ দীর্ঘ ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আরটিভি/এসএস




