২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষণা করা দেশের ৫৫তম বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; যা মোট জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট বক্তৃতায় স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। ফাসিবাদী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও সরঞ্জাম ক্রয়ে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান উন্নয়ন হয়নি।
আরও পড়ুন
বাজেট পাস হচ্ছে আজ, কালোটাকা বাতিলসহ শুল্ক-করে কিছু পরিবর্তন
বাজেট পাস হচ্ছে আজ, কালোটাকা বাতিলসহ শুল্ক-করে কিছু পরিবর্তন
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সে কারণে আজ দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার বিপুলসংখ্যক রোগী বিদেশে যাওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।’
স্বাস্থ্য খাতের রূপরেখায় যা থাকছে-
বাজেটে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
# সার্বজনীন ও ন্যায়সঙ্গত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
#চিকিৎসা-কেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর।
#প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন।
# সব নাগরিককে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদান।
# জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিতভাবে ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা।
# রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন।
জনবল ও চিকিৎসা শিক্ষা
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে জনবল নিয়োগ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই হবে নারী। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। চিকিৎসা শিক্ষায় আধুনিকায়ন আনার লক্ষ্যে ইন্টিগ্রেটেড মডুলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআই-ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
ওষুধ শিল্প ও পুষ্টি
ওষুধ শিল্পের বিকাশ ও ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসার বোঝা কমাতে মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
শিশুদের পুষ্টির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিশুদের খর্বাকৃতি রোধে সরকার বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ করছে।
কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। তার আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এই যাত্রায় দেশের অর্থনীতির পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে উন্নয়ন কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের আকারও।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট এটি। বিশাল নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রতিগুলো পূরণে দেশের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বড় বাজেট তৈরি করেছে সরকার। টাকার অঙ্কে প্রস্তাবিত এ বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
বিরাট এ বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা থেকে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
বিশাল এ বাজেটের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ পথে এগিয়ে নেওয়া।
আরটিভি/এমএইচজে



