শিশুদের নিয়ে গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ , ১০:১২ এএম


শিশুদের নিয়ে গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ায় গত কয়েক দশকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় সামনে এসেছে। প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু মৃত্যুহার কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বেড়েছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি নতুন ও দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

‘ডেভেলপমেন্টাল মেডিসিন অ্যান্ড চাইল্ড নিউরোলজি’ (Developmental Medicine & Child Neurology) জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণা পরিচালনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. নুরুজ্জামান খাঁনসহ দেশি-বিদেশি গবেষকদের একটি দল। গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ড. মো. নুরুজ্জামান খাঁন মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।

গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান—এই ছয়টি দেশের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্বব্যাংক, বিভিন্ন জরিপ, গবেষণা নিবন্ধ এবং আন্তর্জাতিক ডাটাবেসের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা শিশু মৃত্যুহার ও শৈশবকালীন প্রতিবন্ধী হওয়ার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৯০ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ১২৬ শিশুর মৃত্যু হতো, ২০২২ সালে তা কমে ৩৭ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, এই সময়ে শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে।

গবেষকদের মতে, উন্নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, পুষ্টির উন্নতি, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন এ সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৮৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহারের গড় ছিল ৬২ দশমিক ৮ জন। অন্যদিকে, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে গড়ে ৪৭ জন প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবনযাপন করছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, শিশুমৃত্যুর হার কমলেও প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এই দুই প্রবণতা একে অপরকে অতিক্রম করেছে। ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা শিশু মৃত্যুহারের তুলনায় দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান—সব দেশেই এই প্রবণতা দেখা গেছে, যদিও সময়ের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

গবেষণায় শিশুমৃত্যুর হার ও প্রতিবন্ধী শিশু সংখ্যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিপরীত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিশু মৃত্যুহার প্রতি একক কমার বিপরীতে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ০.২৪৫ একক বেড়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং অপরিণত (প্রিটার্ম) জন্মের হার বৃদ্ধির সঙ্গেও প্রতিবন্ধী বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য ব্যয় প্রতি একক বাড়লে প্রতিবন্ধী হার ০.৮৭ একক এবং প্রিটার্ম জন্মের হার বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিবন্ধী হার ০.১৮২ একক বেড়েছে।

গবেষকদের মতে, আগে যেসব শিশু অকাল জন্ম, জন্মের সময় শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ, জন্মগত ত্রুটি কিংবা অন্যান্য জটিলতার কারণে মারা যেত, আধুনিক চিকিৎসা ও নবজাতক সেবার উন্নতির কারণে তাদের অনেকেই এখন বেঁচে যাচ্ছে। তবে এদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ছে। ফলে শিশুমৃত্যু কমলেও প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি শিশু প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবনযাপন করছে। এদের বড় একটি অংশ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে বাস করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবনযাপন করছে। এর মধ্যে সেরিব্রাল পালসি, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা এবং অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার উল্লেখযোগ্য।

গবেষকদের মতে, অপুষ্টি, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, সংক্রমণ, সময়মতো প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর সেবা না পাওয়া, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সীমিত ব্যবহার এবং কম বয়সে অসংক্রামক রোগের বিস্তার শিশুদের প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

তারা আরও বলেন, উন্নত চিকিৎসাসেবার কারণে অকাল জন্ম নেওয়া অনেক শিশু এখন বেঁচে যাচ্ছে। তবে এসব শিশুর মধ্যে সেরিব্রাল পালসি, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা এবং সংবেদনজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন বিকাশগত জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এসব শিশুর জন্য পর্যাপ্ত ফলোআপ, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ এবং পুনর্বাসন সেবার অভাব থাকায় সমস্যাটি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি, প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ পদ্ধতির অগ্রগতি, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়ার কারণে অটিজম ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন সমস্যা আগের তুলনায় বেশি শনাক্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় অপুষ্টি এখনও বড় একটি সমস্যা। বর্তমানে এ অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু খর্বাকৃতির (স্টান্টেড), যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়।

এ ছাড়া নিম্ন আয়ের পরিবারে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, রোগ শনাক্ত করতে দেরি হওয়া এবং চিকিৎসার অভাবও প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি জিনগত ও পরিবেশগত কারণ এবং নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়েও শিশু প্রতিবন্ধী হওয়ার জন্য দায়ী।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবন্ধী শিশুর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনো প্রতিবন্ধী পর্যবেক্ষণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাই এ গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে দেখা উচিত।

গবেষণাটি বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুমৃত্যু কমে যাওয়া একটি বড় অর্জন। তবে একই সঙ্গে শৈশবকালীন প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি নতুন জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তামূলক সেবার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission