বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারকে নিয়ে একটি ইকোনমিক করিডোর স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ত্রিদেশীয় এই অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় দুপুরে চীনের বেইজিংয়ে শি জিনপিং ও তারেক রহমানের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের ‘দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব’ নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। শি জিনপিং আশ্বস্ত করেছেন যে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবে চীন।
হুমায়ুন কবির বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে জোরালো সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। বাংলাদেশ ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে যুক্ত হতে চাইলে স্বাগত জানাবে দেশটি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা অন্তত আরও তিন বছর অব্যাহত রাখতে সমর্থন দেবে বেইজিং। এছাড়া বাংলাদেশকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ১৩টি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩টি এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়েছে। খুব শিগগিরই দুই দেশের সম্মতির ভিত্তিতে ১৬ দফাসংবলিত একটি যৌথ ইশতেহারও প্রকাশ করা হবে।
মাহদী আমিন বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও দেশের অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করতে চায় চীন। সেইসঙ্গে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর করার কথাও আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, কানেক্টিভিটি নিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনকে নিয়ে একটি ‘ইকোনমিক করিডর’ তৈরির প্রস্তাব এসেছে। এর উদ্দেশ্য হবে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক লেনদেন ও বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। মাহদী আমিনের ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো সংলাপে মধ্যস্থতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।
প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা আরও জানান, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালু করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ হবে।
মাহদী আমিন বলেন, এই সফরে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট, আত্মনির্ভরতা ও সম্মানের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত রোববার (২১ জুন) মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে নিজের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস ২০২৬-এ অংশ নিতে চীনের দালিয়ান শহরে যান তিনি। সেখানে দুই দিন বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে বেইজিং পৌঁছান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনাসহ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। পরে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে সই হয়।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেল ৫টায় বেইজিং থেকে সফরসঙ্গীদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
আরটিভি/এসএইচএম




