জাতীয় সংসদে মঙ্গলবার (৩০ জুন) পাস হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। সোমবার (২৯ জুন) অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করা হবে। পরে মঙ্গলবার স্পিকার বাজেটের ওপর কণ্ঠভোট গ্রহণ করবেন। এরপর অর্থবছরের শেষ কার্যদিবসেই বাজেট পাস হয়ে যাবে। ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বাজেটের মূল কাঠামো, আকার কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকছে।
আসতে পারে যেসব পরিবর্তন: জানা গেছে, ব্যাংক হিসাব খুলতে বাধ্যতামূলক কর শনাক্তকরণ নাম্বার (টিআইএন) জমা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট আয়ের নিচেও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে। এ কারণে ব্যাংক হিসাবে টিআইএন জমা দেওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি শিথিল করা হতে পারে। এ ছাড়া কিছু অতিপ্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্কে সামান্য রেয়াত দেওয়া হবে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ কর, তৈরি পোশাক খাতের উৎসে কর, কাঁচামাল আমদানির শুল্ক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কর সুবিধাসহ কয়েকটি বিষয় সংশোধন হতে পারে।
এদিকে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। ফলে যাদের বার্ষিক বেতনভিত্তিক আয় ৬ লাখ টাকার কম (বেতনের এক-তৃতীয়াংশ করমুক্ত সুবিধাসহ), তাদের আয়কর দিতে হবে না। নিয়মিত কর দিয়ে জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের নতুন বিধানও বাতিল করা হচ্ছে। তবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে করদাতাদের করের বোঝা খুব বেশি কমছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুযোগ কমানো, ন্যূনতম করহার বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার ফলে অনেক করদাতাকেই অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে।
করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি: অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল। এবার মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা আরও ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অর্থাৎ এক বছরে করমুক্ত সীমা বেড়েছে মোট ৫০ হাজার টাকা। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সবার কর কমবে না: বিশেষজ্ঞদের মতে, করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য ইতিবাচক। তবে যাদের আয় ব্যবসা, বাড়িভাড়া, কৃষি বা আর্থিক সম্পদ থেকে আসে, তাদের অনেকেরই কর বেড়ে যেতে পারে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, ন্যূনতম করহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে; বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে; কর রেয়াত পেতে বিনিয়োগ মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে এবং সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হবে না; এটি অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় করতে হবে। ফলে রিটার্ন দাখিলের সময় অনেক করদাতাকে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হতে পারে। ফলে করমুক্ত সীমা বাড়লেও প্রকৃত অর্থে করের চাপ আগের মতোই থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
লাগবে না টিআইএন: প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের আপত্তির মুখে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে।
জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের সুযোগ বাতিল: অর্থবিলে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে একটি নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এর আওতায় অতীতে দলিলে কম মূল্য দেখিয়ে কেনা জমি বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য নিয়মিত কর দিয়ে বৈধভাবে প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে ক্রেতাকে দলিল মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্যের ওপর ৩০ শতাংশ এবং বিক্রেতাকে ১৫ শতাংশ মূলধনি কর দেওয়ার বিধান ছিল। তবে বিরোধী মত, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত এই বিধান পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শেয়ারবাজারের জন্য স্বস্তি: প্রস্তাবিত অর্থবিলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর বিদ্যমান ২০ শতাংশ করহার বাতিল করে নিয়মিত করপোরেট করহার আরোপের প্রস্তাব ছিল। এতে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কার্যকর করহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের জোরালো আপত্তির পর সরকার আগের ২০ শতাংশ করহারই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমতে পারে সোনার মূলধনি কর: অর্থবিলে সোনা, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, শিল্পকর্ম, ডিজিটাল মুদ্রাসহ বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনি মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের মূল্য ব্যাপক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার এই করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
এদিকে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। শেষ মুহূর্তে এই করহার অর্ধেকে নামিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে প্রত্যাহার হচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর ০ দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব। মূলত দেশে করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো খুচরা ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়। এ লক্ষ্যে তাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর ০ দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর (এটিএ) আরোপের প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের আপত্তি ও উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে এ কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া গণমাধ্যমকে জানান, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে যদি ধারণা তৈরি হয় যে, ব্যাংক হিসাব খুললেই অতিরিক্ত জটিলতায় পড়বেন, তাহলে তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য আরও স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আরটিভি/এমএইচজে



