কৃষি কল সেন্টার থেকে এক বছরে ৯২ হাজারের বেশি ফোনকলে সেবা নিয়েছেন কৃষকরা। চাঁদপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর মৈশাদী ইউনিয়নের খলিশাডুলী গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম হঠাৎ দেখেন, তার ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দিশেহারা হয়ে তিনি সরকারের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে ফোন করেন। সেখান থেকে কৃষিবিদদের পরামর্শ নিয়ে ক্ষেতে তা প্রয়োগ করেন। এতে সমস্যার সমাধান হয়।
একইভাবে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেনও ফসলের সমস্যা নিয়ে কৃষি কল সেন্টারে ফোন করেন। প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়ে তিনিও উপকৃত হন।
জাহাঙ্গীর বা সাদ্দামই নন, দেশের হাজারো কৃষক কৃষিসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে এখন নির্ভর করছেন সরকারের কৃষি কল সেন্টারের ওপর।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে কল সেন্টারে মোট ৯২ হাজার ৯৪টি ফোনকল ধরা হয়েছে। কৃষিখাতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার প্রতি কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আস্থারই প্রতিফলন এটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেই সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪১টি কল গ্রহণ করা হয়। মে মাসে ৯ হাজার ৯০৩টি এবং জুনে ৮ হাজার ৫৭৬টি কল আসে। বছরের শুরুতে কলের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন ৪ হাজার ৯২৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫ হাজার ৩১৫টি এবং মার্চে ৬ হাজার ৫৭১টি কল গ্রহণ করা হয়। পরে বোরো ধান কাটার মৌসুম ও কৃষি কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় কলের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ৮ হাজার ৪০টি, আগস্টে ৮ হাজার ৮৯টি, সেপ্টেম্বরে ৮ হাজার ৪১৬টি, অক্টোবরে ৭ হাজার ৪০৯টি, নভেম্বরে ৭ হাজার ৯৮৬টি এবং ডিসেম্বরে ৬ হাজার ৭২২টি কল গ্রহণ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৬১২৩ নম্বরে পরিচালিত কৃষি কল সেন্টার দেশের কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম। এখানে কৃষকরা সরাসরি কৃষিবিদদের সঙ্গে কথা বলে ফসল উৎপাদন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনা, আবহাওয়া এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে তাৎক্ষণিক পরামর্শ পাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত এ সেবা বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের তথ্যভিত্তিক সেবার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
এছাড়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণার অংশ হিসেবে কৃষি খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মোবাইল ফোনভিত্তিক সেবা, কৃষি অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে দ্রুত ও সহজে তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি কল সেন্টারে কল সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সেবা চালুর সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি কৃষকদের সচেতনতা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিরও প্রতিফলন।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা শামীম হোসেন বলেন, কৃষি কল সেন্টার বর্তমানে দেশের কৃষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কলের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এ সেবার প্রতি কৃষকদের আস্থার প্রমাণ।
ভবিষ্যতে এ সেবা আরও সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও সহজে এর সুফল পান বলেন তথ্য কর্মকর্তা শামীম।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক মো. মসীহুর রহমান বলেন, কৃষি কল সেন্টার ইতোমধ্যে দেশের কৃষকদের জন্য সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এ সেবার মাধ্যমে কৃষকরা দ্রুত সঠিক পরামর্শ পাচ্ছেন, যা উৎপাদন বৃদ্ধি ও ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবার মান আরও উন্নত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, টেকসই ও উৎপাদনমুখী করতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এটি কৃষকদের ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, রোগবালাই দমন এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কৃষি সেবা পৌঁছে দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত ও সমন্বিতভাবে তথ্য পৌঁছে দিতে কৃষি কল সেন্টার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
মহাপরিচালক জানান, ভবিষ্যতে কৃষি কল সেন্টারের সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও আরও সহজে ও দ্রুত মানসম্মত কৃষি পরামর্শ পাবেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের এ উদ্যোগ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
আরটিভি/এমএম


