ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেখানে পড়ার ও হাসপাতালে ইন্টার্নশিপের নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
শনিবার (১১ জুলাই) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ স্মৃতিচারণ করেন।
জুবাইদা রহমান বলেন, বহুদিন ধরে একটি আর্তনাদ তার কানে ধ্বনিত হয়। সেটি ছিল এক রোগীর পরিবারের সদস্যের। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়া ওই রোগীর সঠিক রোগনির্ণয়ে তাদের ওয়ার্ডের সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন, কারণ সেদিন সিটি স্ক্যান মেশিন অকেজো ছিল। শত চেষ্টা করেও ওই ব্যক্তিকে বাঁচানো যায়নি।
তিনি জানান, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষে এবং পরে ইন্টার্নশিপে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করার সময় বহুবার তিনি এমন অসহায়ত্ব প্রত্যক্ষ করেছেন।
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে জুবাইদা রহমান বলেন, দুই চোখ অন্ধ একটি ছোট শিশু, যে টেট্রালজি অব ফ্যালট (হৃদপিণ্ডের জন্মগত ত্রুটি) রোগে আক্রান্ত ছিল, তিনি সামনে দাঁড়ালে কেমন করে যেন সে বুঝতে পারতো। শেষ পর্যন্ত অপারেশনের টেবিলে শিশুটিকে হারাতে হয়েছিল।
আরেকটি স্মৃতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী বলেন, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় (বিরল ও গুরুতর রক্তের রোগ) আক্রান্ত এক গৃহকর্মী যন্ত্রণায় চিৎকার করতেন। তাই অন্য রোগীদের অনুরোধে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাকে বারান্দায় স্থানান্তর করা হতো।
গাইনি ও অবসটেট্রিকস বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময়ের একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন জুবাইদা রহমান। তিনি বলেন, অষ্টম কন্যাশিশু হবে- আলট্রাসনোগ্রামে এমন তথ্য জানার পর জীবনের ভারে ন্যুব্জ এক রিকশাচালক তার স্ত্রীকে ওয়ার্ডে একা রেখে চলে যান। তার সেই অসহায়ত্ব হয়তো বোঝা যায়। পরে শিশুটির জন্ম হলে দেখা যায়, সেটি পুত্রসন্তান। তবে জন্মের পরপরই শিশুটির শ্বাস নিতে দেরি হচ্ছিল। তাকে দ্রুত পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে ইনকিউবেটরে নেওয়া হয়। পরে শিশুটি বেঁচে যায় এবং পুরো পরিবার আবার একত্র হওয়ায় স্বস্তি ফিরে আসে।
জুবাইদা রহমান বলেন, বর্তমানে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর তার আর কখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা হয়নি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাংলাদেশে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স অ্যান্ড কমপ্যাশন ফর পেশেন্টস’ হিসেবে গড়ে উঠুক।
চিকিৎসাসেবায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, একটি আশ্বস্ত করার বাক্যও ওষুধের মতো কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি জ্ঞান হলেও চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তি মানবিকতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক না কেন, এর কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় মানুষই থাকবে।
ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ২০ থেকে ২৫ বছর পর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান। তার ভাষায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আগামী অধ্যায় শুধু অতীতের গৌরবের ধারাবাহিকতা হবে না; এটি হবে নতুন উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণায় উৎকর্ষ এবং মানবিক নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জুবাইদা রহমান বলেন, আজ তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত থাকলেও তাদের পরিচয়ের শিকড় একটাই- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখন সময় এসেছে অ্যালামনাইকে শুধু স্মৃতির বন্ধনে নয়, দায়িত্বের বন্ধনে যুক্ত করার।
তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার অবকাঠামোয় নয়, তার মানুষের মধ্যে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মেধা, তার মূল্যবোধ ও তার মানুষ। প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন মানুষ, একটি পরিবার ও একটি জীবন।
জুবাইদা রহমান বলেন, ‘৮১তম ডিএমসি ডে-২০২৬’-এ অংশ নিতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। ‘টুগেদার ক্যারি লিগেসি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের জন্য আয়োজক কমিটির সবাইকে তিনি অভিনন্দন ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
আরটিভি/ এসকেডি



