সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ বা তার বেশি বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করায় দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন ২০১৫ সালের পে কমিশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার মতে, শুধু বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র উপায় হতে পারে না; এর সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার ও আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল।
দেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ফরাসউদ্দিন বলেন, ২০১৫ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পার্শ্ববর্তী দেশ বা বৈশ্বিক মানের সঙ্গে বেতন কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। তখনকার বাজেট কাঠামো অনুযায়ী পরিচালন ব্যয় কম থাকায় এতে কোনো মূল্যস্ফীতি ঘটেনি। কিন্তু তৎকালীন সরকার কেবল বেতন বৃদ্ধির অংশটুকু বাস্তবায়ন করলেও পে কমিশনের মূল প্রশাসনিক সংস্কারের সুপারিশগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়।
সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি ও ঘুষ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে ধরে সাবেক এই গভর্নর বলেন, পে কমিশনের প্রতিবেদনে ন্যায়পাল নিয়োগ, নিরপেক্ষ পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সিনিয়র সার্ভিস পুল’ গঠন, ক্যাডার আধিপত্য বন্ধ করা, কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন সুবিধা ও বিশেষ ব্যাংক চালুর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল। তবে প্রধান সমস্যা হলো আমলাতন্ত্রে কোনো জবাবদিহিতা তৈরি করা হয়নি।
তিনি আফসোস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাকে প্রায়ই বলা হয় যে তুমি বেতন ডাবল করলা, আর ঘুষ ডাবল হয়ে গেল। আমার বিশ্বাস, পে কমিশনের আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক সংস্কারের সুপারিশগুলো মেনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে দুর্নীতি এভাবে মারাত্মক রূপ নিত না।’
রাজনীতিবিদ ও আমলাদের সম্পর্কের চাটুকারিতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরাসউদ্দিন বলেন, আমলাদের কাজের মূল্যায়ন হওয়ার কথা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ভিত্তিতে। অথচ বর্তমানে রাজনীতিকদের সামনে ‘হুজুর হুজুর’ করা এবং চাটুকারিতাকেই আনুগত্য হিসেবে দেখা হয়। মূলত সততা, দেশের সেবা করা এবং স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস রাখা—এই তিনটিই হওয়া উচিত আনুগত্যের একমাত্র মাপকাঠি।
প্রশাসনের মান দিনে দিনে নেমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি নিজ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বা পারসপেক্টিভ প্ল্যান তৈরির সময় তিনি ২৫০ পৃষ্ঠার দলিলকে সংক্ষিপ্ত করে ৯৬ পৃষ্ঠায় রূপ দেন। সেখানে দুটি মূল সুপারিশ ছিল—ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় আনা এবং আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলের লেজবৃত্তি বা তোষামোদ থেকে বিযুক্ত করা।
ফরাসউদ্দিন জানান, এই দুটি সুপারিশ করার পর সরকারের প্রভাবশালী মহল, তৎকালীন প্ল্যানিং কমিশনের মেম্বার ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাকে রাজনীতিকদের ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ওই গুরুত্বপূর্ণ নথি থেকে সুপারিশ দুটি কেটে ফেলা হয় এবং ডকুমেন্টের মালিকানা থেকেও তাকে বঞ্চিত করা হয়।
প্রশাসনের এই দলীয়করণের ধারা বন্ধ না হলে আমলাতন্ত্রের মানোন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের মতো আমলাতন্ত্রকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে রাখতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় আনুগত্যের চশমা খুলে পেশাদারিত্ব ও সততার জায়গায় ফিরিয়ে না আনলে বেতন-ভাতা বাড়িয়েও দুর্নীতি রোধ করা যাবে না।
আরটিভি/এআর




