ইসলাম ধর্মে রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধুমাত্র খাবার বা পানীয় ত্যাগ নয়, বরং আত্মসংযম, ধৈর্য্য, এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। মুসলিমরা প্রতি বছর রমজান মাসে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখেন। রোজার মাধ্যমে মুসলিমরা আল্লাহর কাছাকাছি যায়, নিজের মন ও শরীর নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং দারিদ্র্য ও অভাবীদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)
নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: "যে অসুস্থ বা ভ্রমণরত, সে পরে রোজা পূরণ করবে।" (সহীহ মুসলিম)
এই বাণী রোজার বিধানকে মানবিক ও বাস্তবধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে।
রোজার গুরুত্ব
রোজা কেবল খাদ্য-দাওয়া ত্যাগ নয়, এটি আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। এর মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো:
আধ্যাত্মিক উন্নতি
রোজা মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে এবং খারাপ অভ্যাস থেকে বিরত রাখে। রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুসলিম ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা ও ধ্যানশীলতা অর্জন করে।
সামাজিক সহানুভূতি
ক্ষুধার্ত ও দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি জাগায়। যারা খাদ্যের অভাবে ভুগছে, তাদের কষ্ট বোঝার মাধ্যমে দান ও সাহায্যের মনোভাব তৈরি হয়।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য
রোজা শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। খাদ্য ও পানীয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে শক্তি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
আধ্যাত্মিক ধ্যান ও কৃতজ্ঞতা
রোজা মানুষকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি প্রকাশের সুযোগ দেয়। প্রতিদিন খাবারের প্রাপ্যতায় ধন্যবাদজ্ঞাপন এবং সৃষ্টির প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
রোজা থেকে শিথিলতা: ছয়টি কারণ
ইসলামে কিছু বিশেষ ব্যক্তিকে রোজা থেকে শিথিল থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল মানুষের স্বার্থ ও স্বাস্থ্যের জন্য, কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
ছয়টি শিথিলতার কারণ হলো:
১. অসুস্থ ব্যক্তি
যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, তাদের জন্য রোজা রাখা বিপজ্জনক হতে পারে।
কারণ: রোজা রাখার সময় দীর্ঘ সময় খাবার বা পানি না খাওয়া শরীরের শক্তি কমিয়ে দিতে পারে। জ্বর, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে রোজা রাখলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
উদাহরণ: চিকিৎসাধীন একজন ব্যক্তি রোজা রাখতে পারছে না। পরে সুস্থ হলে সে রোজা পূরণ করতে পারে বা ফিদিয়া দিতে পারে।
২. বৃদ্ধ ব্যক্তি
বয়সের কারণে শরীর দুর্বল হলে দীর্ঘ রোজা রাখা কঠিন।
কারণ: বৃদ্ধদের হজম প্রক্রিয়া ধীর, দেহের পানি ও শক্তি দ্রুত কমে যায়। দীর্ঘক্ষণ রোজা রাখলে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
উদাহরণ: ৭০–৮০ বছরের বৃদ্ধ ব্যক্তি দীর্ঘ রোজা রাখলে শরীরের সমস্যা হতে পারে। ইসলাম এই কারণে বৃদ্ধদের শিথিল থাকার অনুমতি দিয়েছে।
৩. গর্ভবতী নারী
গর্ভধারণের সময় রোজা রাখা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ: রোজা রাখলে মা ও শিশুর পুষ্টি কমতে পারে, যা স্বাস্থ্যের ক্ষতি বা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উদাহরণ: গর্ভবতী মহিলারা রোজা শিথিল থাকেন এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার পর বাকি রোজা পূরণ করেন।
৪. শিশু
ছোট শিশুরা সাধারণত রোজা রাখতে সক্ষম নয়।
কারণ: শিশুদের শরীর ও হজম ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানীয় না খেলে শক্তি কমে যেতে পারে এবং স্বাস্থ্যের সমস্যা হতে পারে।
উদাহরণ: ৭–৮ বছরের শিশু ধাপে ধাপে রোজা শেখে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে পূর্ণ রোজা রাখতে সক্ষম হয়।
৫. ভ্রমণরত ব্যক্তি
দীর্ঘ যাত্রা বা কঠিন ভ্রমণে রোজা রাখা শারীরিকভাবে কঠিন হতে পারে।
কারণ: ভ্রমণে শরীরের শক্তি ও জলাশয় দ্রুত হ্রাস পায়। গাড়ি, ট্রেন বা বিমান চলাচলের সময় দীর্ঘ রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
উদাহরণ: একজন ব্যবসায়ী বা ছাত্র যাত্রার সময় রোজা রাখতে না পারলে। পরে স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্ণ রোজা পালন করবে।
৬. মাসিক/পরিশেষকালীন সময়ে
মহিলাদের মাসিক বা পরিশেষকালীন সময়ে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
কারণ: এই সময়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে, এবং রোজা রাখলে শারীরিক দুর্বলতা ও অসুবিধা বৃদ্ধি পায়।
উদাহরণ: মহিলারা এই সময়ে রোজা শিথিল থাকেন এবং পরে পূর্ণ রোজা পূরণ করেন। (সহীহ বুখারী)
> রোজা কেবল খাদ্য-দাওয়া ত্যাগ নয়, এটি আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। ইসলামের বিধান কখনো মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন নয়।
ছয় ধরনের শিথিলতা মানবিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা এই কারণে রোজা রাখতে অক্ষম, তারা পরে রোজা পূরণ বা ফিদ্যা দিয়ে দায়িত্ব পালন করে।
> এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম সহানুভূতিশীল, বাস্তবমুখী এবং মানবিক ধর্ম, যা মানুষের স্বার্থ এবং বাস্তবিক জীবনপরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখে।
আরটিভি/এমএইচজে




