ঈদুল আজহা সামনে এলেই মুসলিম সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে স্ত্রীর দেনমোহর বা মোহরানা বাকি থাকলে স্বামী কি কোরবানি দিতে পারবেন? আবার অনেকে জানতে চান, দেনমোহর পরিশোধ না করা অবস্থায় কোরবানি আদৌ ওয়াজিব হয় কি না।
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে দেনমোহর ও কোরবানি দুটি ভিন্ন বিষয়। দেনমোহর হলো স্ত্রীর অধিকার, আর কোরবানি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে দেনমোহর বকেয়া থাকলে কোরবানির বিধান কী হবে এ বিষয়ে ফিকহের কিতাবসমূহে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।
দেনমোহর কি ঋণ হিসেবে গণ্য?
ইসলামী আইন অনুযায়ী, স্বামী যতদিন পর্যন্ত স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ না করেন, ততদিন তা তার ওপর ঋণ হিসেবেই থেকে যায়। তবে ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব বাদায়েউস সানায়ে ও রদ্দুল মুহতারে এ ধরনের ঋণকে “দাইনে জইফ” বা দুর্বল ঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিকহবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, দাইনে জইফ হলো এমন ঋণ, যা সরাসরি কোনো সম্পদ বা ব্যবসায়িক লেনদেনের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়নি। মোহরানা যেহেতু বিয়ের চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাই এটি সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
এ কারণে দেনমোহর বকেয়া থাকলেও তা স্বামীর মালিকানাধীন সম্পদের ওপর সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। ফলে ব্যক্তি শরিয়তের দৃষ্টিতে ধনী বা নিসাবের মালিক হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
দেনমোহর বাকি থাকলে কোরবানি কি ওয়াজিব?
এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের বিধান মূলত ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে।
নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে
যদি কোনো ব্যক্তির কাছে কোরবানির দিনগুলোতে (১০ থেকে ১২ জিলহজ) প্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে দেনমোহর বাকি থাকলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। তিনি কোরবানি দিতে পারবেন এবং তা আদায় হয়ে যাবে।
নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে
অন্যদিকে, দেনমোহরের অর্থ হিসাব করার পর যদি স্বামীর কাছে অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। বিশেষ করে মোহরে মুয়াজ্জাল (পরবর্তীতে পরিশোধের শর্তে নির্ধারিত দেনমোহর) যদি এমন অবস্থায় থাকে যে তা পরিশোধ করলে ব্যক্তি নিসাবের মালিক থাকেন না, তাহলে কোরবানি না করলেও তিনি গুনাহগার হবেন না।
ফিকহি সূত্র কী বলছে?
ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ বাদায়েউস সানায়ে (২য় খণ্ড, ৩৯২ পৃষ্ঠা)-এ উল্লেখ রয়েছে, সম্পদের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়নি এমন ঋণ, যেমন মোহরানা, “দাইনে জইফ” হিসেবে গণ্য।
এছাড়া রদ্দুল মুহতার (৯ম খণ্ড, ৪৫৩ পৃষ্ঠা)-এও বর্ণিত হয়েছে যে, এ ধরনের ঋণ কোরবানির সামর্থ্য নির্ধারণে সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না।
স্ত্রীর হক আদায়ে গুরুত্ব
ইসলামী চিন্তাবিদরা মনে করেন, দেনমোহর বকেয়া থাকলেও কোরবানি সহিহ হবে। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধে গাফিলতি করা উচিত নয়। কারণ স্ত্রীর হক আদায় করা স্বামীর নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
তাই কোরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব ও স্ত্রীর অধিকার আদায়ের বিষয়েও সমান সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আরটিভি/এসকে




