যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করলে কি কবুল হবে না

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ , ১০:৫৬ পিএম


যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করলে কি কবুল হবে না
ছবি: সংগৃহীত

দেশের কিছু এলাকায় একটি কুপ্রথা প্রচলিত আছে, পবিত্র ঈদুল আজহার সময় মেয়ের বাড়িতে কোরবানির পশু পাঠাতে হয়। ঈদ এলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় কোরবানির পশু এলো, তা নিয়ে এলাকা সরগরম থাকে। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এভাবে প্রাপ্ত পশু দিয়ে কোরবানি করা কি বৈধ?

যৌতুকের পশু ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে যৌতুক একটি অভিশপ্ত প্রথা। বিয়ের সময় বা পরবর্তীতে কনেপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কোনো কিছু আদায় করা স্পষ্ট হারাম। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:

‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
সামাজিক চাপে পড়ে বা লোকলজ্জার ভয়ে কনেপক্ষ যখন জামাতার বাড়িতে পশু পাঠায়, তখন তা উপহারের খোলসে মূলত ‘যৌতুক’ হয়ে দাঁড়ায়। জবরদস্তি বা মানসিক চাপ দিয়ে নেওয়া এই সম্পদ ইসলামে অবৈধ।

কেন যৌতুকের পশুতে কোরবানি হবে না?
যৌতুকের পশু দিয়ে কোরবানি করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ধর্মীয় ও নৈতিক ঝুঁকি রয়েছে:

১. কবুল না হওয়ার আশঙ্কা: আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি পবিত্র (হালাল) বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না (সহিহ্ মুসলিম: ২২৩৬)। অন্যায়ভাবে অর্জিত বা জুলুমের মাধ্যমে প্রাপ্ত পশু দিয়ে কোরবানি করলে তা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

২. ইখলাস বা নিয়ত নষ্ট হওয়া: কোরবানির মূল ভিত্তি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। যখন কোরবানির পশু ‘কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় গরু এল’—এমন প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইবাদত আর আল্লাহর জন্য থাকে না; বরং তা সামাজিক প্রদর্শনী ও লোকদেখানো উৎসবে পরিণত হয়।

৩. অহংকার ও গর্ব সৃষ্টি: যৌতুকের পশু নিয়ে পরিবারে যে দম্ভ তৈরি হয়, তা ইবাদতের মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। ‘আল্লাহ তাআলা কোনো দাম্ভিক বা অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান: ১৮)

৪. সামাজিক কুপ্রথাকে শক্তিশালী করা: এই প্রথা চালু রাখলে সমাজে এটি বাধ্যতামূলক মনে করা হয়, যা গরিব কনেপক্ষের ওপর বড় ধরনের জুলুম। মন্দ কাজে বা সীমা লঙ্ঘনে সহযোগিতা করা ইসলামে নিষেধ। (সুরা মায়িদা: ২)

উপহার বনাম যৌতুক: পার্থক্য কোথায়?
প্রশ্ন উঠতে পারে, উপহার দেওয়া কি জায়েজ নয়? অবশ্যই জায়েজ। তবে তার কিছু শর্ত রয়েছে:

স্বতঃস্ফূর্ততা: কনেপক্ষ কোনো প্রকার সামাজিক চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়াই নিজের খুশি মনে দিলে তা ‘হাদিয়া’ বা উপহার হিসেবে গণ্য হবে।

বিয়ের ‘জাহাজ’: নবীজি (সা.) তাঁর মেয়ে হজরত ফাতেমা (রা.)-এর বিয়েতে একটি চাদর, পানির মশক ও বালিশ উপহার দিয়েছিলেন। এটি ছিল সামর্থ্য অনুযায়ী খুশি মনে দেওয়া, কোনো দাবি বা রেওয়াজ পালনের চাপ নয়।

দেনমোহর বনাম যৌতুক
বর্তমানে সমাজে দেনমোহর আদায়ের প্রবণতা কম থাকলেও যৌতুক নেওয়ার তোড়জোড় বেশি। অথচ দেনমোহর হলো নারীর অধিকার এবং বিয়ে বৈধ হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। মোহরানা আদায়ের ইচ্ছা না থাকলে হাদিসে তাকে ‘ব্যভিচারী’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (তাবারানি শরিফ)। ইসলাম বলছে নারীর অধিকার (মোহর) দাও, আর কু-প্রথা বলছে নারীর পরিবারের সম্পদ (যৌতুক) কেড়ে নাও—যা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

আমাদের করণীয়
কোরবানি একটি মহান ইবাদত। এই ইবাদতকে কলুষিত করা থেকে বাঁচতে বরপক্ষকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

কনেপক্ষকে আগে থেকেই বিনয়ের সঙ্গে পশু বা উপহার পাঠাতে নিষেধ করা উচিত।

সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করতে হবে যাতে কোনো বাবা তাঁর মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পশু পাঠাতে বাধ্য না হন।

কোরবানি হলো ত্যাগের শিক্ষা। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে বা কাউকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব নয়। তাই যৌতুকের পশু বর্জন করে নিজের হালাল উপার্জনে কোরবানি করাই মুমিনের পরিচয়।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission