পবিত্র কাবার গিলাফে ক্যালিগ্রাফির নেপথ্যে এক বাংলাদেশি 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬ , ০৮:০৪ পিএম


পবিত্র কাবার গিলাফে ক্যালিগ্রাফির নেপথ্যে এক বাংলাদেশি 
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছর পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনকালে লাখ লাখ মুসলমান মক্কার মাসজিদুল হারামে কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। তাওয়াফকালে কাবা শরিফের ওপর জড়ানো সোনা ও রুপার সুতোয় বোনা কালো কাপড়ের গিলাফটির (কিসওয়া) দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। কাবার গিলাফে খোদাই করা এই পবিত্র কোরআনের আয়াত ও ক্যালিগ্রাফির পেছনের মূল রূপকার হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুখতার আলম সিকদার। ২০০২ সাল থেকে এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই গুণী শিল্পীকে তার অসামান্য দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।  

মুখতার আলমের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার রশিদের ঘোনা গ্রামে। তার বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাইল সিকদার। তবে মুখতার আলমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরবেই। শৈশব থেকেই আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক ও অনুরাগ।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুখতার আলম সিকদার

শিক্ষাজীবনে মুখতার আলম মক্কার বিখ্যাত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে চারুকলা শিক্ষায় স্নাতক এবং ২০০১ সালে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে বিশেষায়িত হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা শিক্ষা বিভাগে ক্যালিগ্রাফির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

যেভাবে ক্যালিগ্রাফার হলেন

১৪২২ হিজরিতে জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ সালেম বাজনাইদের সঙ্গে মুখতার আলমের সাক্ষাৎ হয়। আলমের অসাধারণ কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে বাজনাইদ তার জীবনবৃত্তান্ত ও কাজের নমুনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (প্রেসিডেন্সি) কাছে পাঠান। এরপর উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার মাধ্যমে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে জমাদিউল আউয়াল ১৪২৩ হিজরিতে (জুলাই ২০০২) মক্কার কিসওয়া কারখানার প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত হন মুখতার আলম।

আরও পড়ুন

কিসওয়ার ক্যালিগ্রাফিতে মূলত ‘থুলুথ’ লিপি ব্যবহার করা হয়, যার মূল নকশাকার ছিলেন শেখ আব্দুল রহিম আমিন বুখারী। মুখতার আলম এই মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন না এনে এর পরিমাপ, অক্ষরের আকার, লিপির চওড়াভাব এবং সূক্ষ্মতায় দারুণ কিছু আধুনিক পরিমার্জন ঘটান। কিসওয়ার বৃত্ত, চতুর্ভুজ ও ফ্রেমগুলোর মধ্যকার অনুপাত নিখুঁত করার পাশাপাশি কাবার দরজার পর্দা ও চারপাশের ফ্রেমের আলংকারিক নকশাকে তিনি আরও আকর্ষণীয় করে তোলেন। শুধু তা-ই নয়, এই ঐতিহ্যবাহী কাজে নিখুঁত ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি একটি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ক্যালিগ্রাফি প্রোগ্রাম বা ডিজিটাল প্রযুক্তি চালু করেন।

কেবল ক্যালিগ্রাফির মধ্যেই মুখতার আলমের কাজ সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮০ সালে তিনি মক্কার ‘চ্যারিটেবল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য মেমোরাইজেশন অব দ্য হোলি কুরআন’-এ যোগ দিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর শিক্ষকতা করেন। এ ছাড়া মাসজিদুল হারামের ভেতরে অবস্থিত ‘দার আল-আরকাম ইনস্টিটিউট’-এ তিন বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০০২ এবং ২০১১ সালে তিনি পবিত্র কুরআনের ওপর দুটি ‘ইজাজাহ’ (সনদ) লাভ করেন।

তিনি মক্কার কুরআন মুখস্থকরণ সংস্থার তত্ত্বাবধায়ক, জেদ্দার হ্যান্ডস ক্রাফট অ্যাসোসিয়েশনের আরবি ক্যালিগ্রাফি উপদেষ্টা, জেদ্দা আরবি ক্যালিগ্রাফি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং সৌদি সায়েন্টিফিক সোসাইটি ফর অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফির একজন সম্মানিত সদস্য। ১৯৮৯ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় তিনি ফার্সি ক্যালিগ্রাফির জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতার বিচারক প্যানেলের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভাবান ও দক্ষ বিদেশি পেশাজীবীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার এক বিশেষ রাজকীয় ডিক্রির অধীনে মুখতার আলমকে সৌদি আরবের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এই গৌরবময় অর্জনের পর মক্কার মাসজিদুল হারামের (গ্র্যান্ড মস্ক) প্রধান ইমাম তার সম্মানে একটি জমকালো সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন এবং তার হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।

আরটিভি/এআর  

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission