ইসলামে কি খেলাধুলা নিষিদ্ধ? যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

আরটিভি নিউজ

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬ , ০৬:২৯ পিএম


ইসলামে কি খেলাধুলা নিষিদ্ধ? যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ
শায়খ আহমাদুল্লাহ-ছবি: সংগৃহীত

খেলাধুলা কি ইসলামে বৈধ, নাকি এটি অনর্থক সময় নষ্টের মাধ্যম? আধুনিক যুগে এই প্রশ্নটি মুসলিম সমাজে বারবার আলোচনায় আসে। বিশেষ করে বিভিন্ন খেলাধুলা, বিনোদন এবং সেগুলোকে ঘিরে অতিরিক্ত উন্মাদনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়েখ আহমাদুল্লাহ। তিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে খেলাধুলা, বিনোদন, মানসিক প্রশান্তি এবং শরিয়তের সীমারেখা সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেন।

সম্প্রতি এক অনলাইন লাইভ প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শায়েখ আহমাদুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, ইসলামে খেলাধুলার বিধান কী? সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আলেমের বক্তব্য দেখে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যেন কোনো খেলাধুলাই করা যাবে না। অথচ একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য তো বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

এই প্রশ্নের জবাবে শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, একজন মানুষ সুস্থভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন, মহান আল্লাহ সেসবেরই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানে এমন বহু স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক উপায় রয়েছে, যা মানুষের সুস্থ বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির উৎস হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ইসলাম সুন্দর ও সুখী পারিবারিক জীবন গঠনে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ একটি আনন্দময় পরিবার মানুষের মানসিক সুস্থতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক সমাজে মানুষ ক্রমেই এই পারিবারিক আবহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে যে মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয়, সে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً

‘আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)

শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাআলা তার সঙ্গী হিসেবে হজরত হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন, যাতে তিনি তার সান্নিধ্যে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থারই একটি অংশ।

তিনি বলেন, মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুস্থ বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা প্রয়োজন। তবে সেই বিনোদন হতে হবে স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে। তাহলেই তা মানুষকে প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি দিতে সক্ষম হবে।

বর্তমানে খেলাধুলা দেখা, বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন কিংবা সেগুলোকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আসক্তির মাধ্যমে মানুষ যে সুখ খুঁজছে, তা আদৌ প্রকৃত সুখ এনে দিচ্ছে কি না— এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তার মতে, উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, খেলাধুলা ও বিনোদনের বিপুল আয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিষণ্নতা ও মানসিক অস্থিরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। কারণ মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত স্বাভাবিক প্রশান্তির পথ ছেড়ে কৃত্রিম আনন্দের পেছনে ছুটছে।

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, এই কৃত্রিম বিনোদন মানুষকে প্রকৃত সুখ দিতে পারে না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা মানুষকে আরও অস্থির ও বিষণ্ন করে তোলে।

এরপর তিনি খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, ইসলামে খেলাধুলা ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ নয়। বরং যেসব খেলায় শরীরচর্চা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তব জীবনের উপকারিতা রয়েছে, ইসলাম সেগুলোকে উৎসাহিত করেছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, নবী করিম (সা.) নিজেই হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: سَابَقَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَسَبَقْتُهُ...

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। একবার আমি তাকে হারিয়েছিলাম, পরে আরেকবার তিনি আমাকে হারিয়ে বললেন, ‘এটি আগেরবারের বদলা।’ (আবু দাউদ ২৫৭৮)

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজি এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে—এমন বিভিন্ন প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করেছেন।

তিনি বলেন, তাই যেসব খেলায় শরীরচর্চার সুযোগ রয়েছে এবং যা মানুষের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায়, শরিয়ত সেগুলোকে নিষিদ্ধ করেনি। 

একইভাবে ফুটবল, ক্রিকেটসহ আধুনিক খেলাধুলাও বৈধ, যদি সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকে। যেমন সতর উন্মুক্ত না হওয়া, জুয়া বা বাজি না থাকা এবং কোনো হারাম কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়া।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো বৈধ খেলাও যখন মানুষের কাছে জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, ইবাদত-বন্দেগি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় কিংবা দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার কারণ হয়, তখন সেটি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে তিনি কুরআনের একটি আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।’ (সুরা আল-মুনাফিকুন: আয়াত ৯)

পরিশেষে তিনি বলেন, যেসব খেলায় কোনো শারীরিক উপকারিতা নেই এবং যা কেবল সময় নষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায়, যেমন— পাশা খেলা; এসব বিষয়ে ইসলামে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا غَمَسَ يَدَهُ فِي لَحْمِ خِنْزِيرٍ وَدَمِهِ

‘যে ব্যক্তি পাশা খেলল, সে যেন শূকরের গোশত ও রক্তে নিজের হাত ডুবাল।’ (মুসলিম ২২৬০)

শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, তাস, পাশা কিংবা জুয়ায় রূপ নেওয়া এ ধরনের খেলাগুলো মানুষকে গঠনমূলক কোনো উপকার দেয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো মানসিক অস্থিরতা, সময়ের অপচয় এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলা কোনোভাবেই নিষিদ্ধ নয়। বরং শরীর সুস্থ রাখা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈধ বিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলাধুলা উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে শর্ত হলো— এতে যেন হারাম কোনো উপাদান না থাকে, ইবাদত ও দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় এবং তা যেন মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে না দাঁড়ায়। 

অর্থাৎ ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার শিক্ষা দেয়, যেখানে বিনোদন থাকবে, কিন্তু তা হবে আল্লাহর বিধান ও নৈতিকতার সীমারেখার ভেতরে।

সূত্র: ইউটিউব, শায়েখ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল চ্যানেল

আরটিভি/এমএ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission