রোববার, ২৪ মে ২০২৬ , ০১:২৮ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীর কামারপল্লীগুলো এখন ব্যস্ততম সময় পার করছে। কারওয়ান বাজার, পুরান ঢাকার কাপ্তান বাজার ও নয়াবাজারজুড়ে সারাদিন ভেসে আসছে লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। কোথাও দগদগে লাল লোহা হাতুড়ির আঘাতে আকার পাচ্ছে দা কিংবা বঁটির, কোথাও আবার শান দেওয়া হচ্ছে ছুরি-চাকুতে।
কারওয়ান বাজারে গত ৯ বছর ধরে দা, বটি ও ছুরি তৈরির কাজ করছেন কর্মকার আরিফুল হক। অন্য সময়ের তুলনায় এখন তার ব্যস্ততা অনেক বেশি। জ্বলন্ত লোহা ধরে আছেন আরিফুল; দুই পাশে মারুফ হাসান ও কামাল সরকার ভারী হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে লোহাকে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় আকার। দম ফেলারও যেন সময় নেই তাদের। কারণ, আর মাত্র কয়েক দিন পরই কোরবানির ঈদ। আর এই ঈদকে ঘিরেই তাদের বছরের সবচেয়ে বড় বেচাকেনা হয়।
আরিফুল হকের দোকানের মতো চারপাশের দোকানগুলোতেও একই দৃশ্য। কাজের ফাঁকে কারিগররা জানান, কোরবানির ঈদই মূলত তাদের ব্যবসার মূল মৌসুম। এই সময় ঈদের রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ভোররাত থেকে শুরু হয়ে কাজ চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। প্রচুর অর্ডারের সরঞ্জাম তৈরি ও ডেলিভারি দিতে হয়। পাশাপাশি দোকানে বিক্রির জন্যও প্রস্তুত রাখতে হয় নানা ধরনের দা, বটি ও ছুরি। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১২০টি বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে কারওয়ান বাজার, কাপ্তান বাজার ও নয়াবাজার ঘুরে দেখা যায়, কর্মকারদের দোকানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ব্যক্তি থেকে শুরু করে পেশাদার কসাই—সবাই কোরবানির সরঞ্জাম কিনতে ভিড় করছেন। দোকানিরাও গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের দা-বটি-ছুরি দেখিয়ে মান ও দামের বিষয়ে বোঝাচ্ছেন।
কারওয়ান বাজারে কোরবানির ছুরি কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা আশরাফুল হক বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে কোরবানি হবে। দুই বছর আগেও এখান থেকে সরঞ্জাম নিয়েছিলাম। এখানকার লোহার তৈরি সরঞ্জাম ভালো মানের, মাংস কাটতেও সুবিধা হয় এবং টেকসই। তাই এবারও এখান থেকে কেনা।’
ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনা বেশ ভালো। কারওয়ান বাজারের এম এস আল-আমিন হার্ডওয়ারের মালিক আল আমিন বলেন, এবার বেশি বিক্রির আশায় প্রায় ৬ লাখ টাকার সরঞ্জাম দোকানে তুলেছেন, যা গতবারের চেয়েও বেশি। চাঁদ রাত পর্যন্ত বিক্রি চললে পুরো চালান শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
লোহার তৈরি হওয়ায় এসব সরঞ্জামের দাম সাধারণত ওজন ও আকারভেদে নির্ধারণ করা হয়। বাজারে মানভেদে বটি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, দা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, সাধারণ ছুরি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা এবং জবাইয়ের বড় ছুরি ৯০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া হাসুয়ার দাম ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। মাংস কাটার ৮ ও ১২ পিসের চপার সেট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়। পাশাপাশি অনেকে পুরোনো সরঞ্জাম ধার করাতে নিয়ে আসছেন। আকারভেদে শান দেওয়ার খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা।
কর্মকারদের দোকানের পাশেই বিক্রি হচ্ছে কোরবানির কাজে ব্যবহৃত বাঁশের চাটাই ও তেঁতুল কাঠের খণ্ড বা ‘খাইট্টা’। আকারভেদে চাটাই বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং প্রতি পিস খাইট্টা ৩০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজার কর্মকার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হারুন বলেন, খাটি লোহা দিয়ে সরঞ্জাম তৈরি করা হয় বলে এই বাজারের আলাদা নামডাক রয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকেও মানুষ এখানে আসেন। অনেকে আবার অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ছুরি-চাকু তৈরি করাচ্ছেন। গতবারের তুলনায় এবার প্রত্যেক ব্যবসায়ী বেশি বিনিয়োগ করেছেন এবং ভালো বিক্রির আশা করছেন।
সূত্র: বাসস
আরটিভি/এআর