বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ , ০৪:২২ পিএম
কুয়াকাটা সৈকতে বিপন্ন প্রজাতির মৃত ইরাবতী ডলফিন ভেসে এসেছে। ডলফিনটির শরীরের চামড়া উঠে গেছে, পেট ফেটে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল ৬টার দিকে সৈকতের জিরো পয়েন্টের পশ্চিম পাশে জোয়ারের পানির সঙ্গে ডলফিনটি ভেসে আসে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উপরা’র সদস্য আব্দুল জলিল প্রথমে ডলফিনটি দেখতে পেয়ে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন। এ ধরনের ডলফিনের মাথা গোলাকার এবং সাধারণ ডলফিনের মতো লম্বা ঠোঁট থাকে না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগভীর উপকূলীয় জল ও বড় নদীগুলোতে এদের বিচরণ দেখা যায়। বিপন্ন এ প্রজাতি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য স্পষ্ট অশনিসংকেত। ডলফিনের মৃত্যু উপকূলীয় পরিবেশের অবনতির বার্তা দেয়। দ্রুত কারণ উদ্ঘাটন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
উপকূল পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, বারবার মৃত ডলফিন ও কচ্ছপ ভেসে আসা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকির ইঙ্গিত। অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা, প্লাস্টিক দূষণ এবং নৌযানের অসচেতন চলাচল এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
মহিপুর রেঞ্জের বন বিভাগ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, ডলফিনটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরে ডলফিন রক্ষা কমিটি, কুয়াকাটা পৌরসভা, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে মৃত ডলফিনটি মাটি চাপা দেন। সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
ওয়ার্ল্ডফিশের সাবেক গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, এটি একটি ইরাবতী ডলফিন। ডলফিনটির মৃত্যুর কারণ হলো মাছ ধরার জাল বা দড়িতে জড়িয়ে পড়া। এটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। তাই এটি সংরক্ষণের জন্য ডলফিন-বান্ধব জাল ব্যবহার, জালে অ্যাকুস্টিক পিঙ্গার বা শব্দ সিগন্যাল বসিয়ে ডলফিনকে দূরে রাখা, ডলফিনের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল যেমন নদী-মোহনা এলাকায় নির্দিষ্ট অঞ্চলকে মাছ ধরা নিষিদ্ধ বা সীমিত করা, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ প্রদান (যাতে জালে ডলফিন আটকে পড়লে দ্রুত ও নিরাপদে ছাড়ানো যায়), দ্রুত উদ্ধারকারী দল গঠন ও হটলাইন চালু রাখা, এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে গ্রহণ করলে এই বিপন্ন প্রজাতির অকাল মৃত্যু অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা জানান, শুধু ইরাবতী ডলফিনই নয়, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সব ধরনের ডলফিনই সংরক্ষিত।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন- ২০১২ অনুযায়ী ডলফিন হত্যা করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড বিধান অন্তর্ভুক্ত করা রয়েছে। এ ছাড়া মৃত ডলফিনের দেহাবশেষ অবৈধভাবে কারো কাছে পাওয়া গেলেও সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডই হতে পারে।
আরটিভি/এসএস