সোমবার, ০৪ মে ২০২৬ , ১১:৩০ এএম
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় প্রায় ১০ একর আয়তনের ঐতিহ্যবাহী ‘ধর্মঘর দিঘি’ ইজারা নিয়ে এলাকাজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বিধিমালা উপেক্ষা করে একটি বিতর্কিত সমবায় সমিতির নামে ৩ বছর মেয়াদে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকায় দিঘিটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। অথচ গত বছরের একই মেয়াদের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১৮ লাখ টাকা।
স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি, এত বড় একটি দিঘির প্রকৃত বাজারমূল্য আরও অনেক বেশি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে একই দিঘি তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে ইজারা হয়েছে। এমনকি চলতি বছরেও ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় ইজারা নিতে আগ্রহী ছিলেন একাধিক ব্যক্তি। পাশের আহমেদপুর দিঘি, যা আয়তনে ছোট, সেটিও প্রায় ৩০ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারা পাওয়া ‘ধর্মঘর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি’র গত তিন বছরের কোনো বৈধ অডিট প্রতিবেদন নেই- যা ইজারা বিধিমালার পরিপন্থি।
এছাড়া সমিতিতে প্রকৃত মৎস্যজীবীর উপস্থিতিও নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি 'টেন্ডার ইঞ্জিনিয়ারিং' এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে বড় ধরনের দুর্নীতি ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইজারার জন্য নিলাম আহ্বান করা হলেও সেদিন উক্ত সমিতির সভাপতি তাজুল ইসলাম বা তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই ফোনের মাধ্যমে তাদেরকে ইজারা দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনো জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় যুবদল নেতা আমিনুর রহমান আমিনসহ আরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে মানববন্ধনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এছাড়া তারা স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ইজারাপ্রাপ্ত ধর্মঘর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, গত ৯ তারিখ ফোনে আমরা ইজারা পাওয়ার খবর পাই। এখন আমরা বৈধভাবে দায়িত্ব নিয়েছি। সরকারি মূল্য কেন কম নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি ইউএনও স্যারের বিষয়। আমাদেরও প্রায় ৮ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য নারায়ণ নয়ন বলেন, এখানে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। আমরা ২৫ লাখ টাকা দিয়ে ইজারা নিতে রাজি ছিলাম। কিন্তু গোপনে নিলাম হওয়ায় অংশ নিতে পারিনি। প্রয়োজনে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব।
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সমিতির অডিট রিপোর্ট প্রসঙ্গেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেম বলেন, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিলাম সম্পন্ন হয়েছে। কেউ বেশি দামে নিতে চাইলে নিলামে অংশগ্রহণ করা উচিত ছিল।
তবে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা অডিট প্রতিবেদন সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি নির্দিষ্ট কোনো জবাব দেননি।
এদিকে এ অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুইজন স্থানীয় ব্যক্তি ইউএনও ও সমবায় অফিসে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
হবিগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক মোহাম্মদ এরশাদ আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রধান কার্যালয়ে নোট পাঠিয়েছি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় অনেক কম দামে ইজারা দেওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে। তারা দ্রুত তদন্ত করে ইজারা বাতিল এবং পুনরায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিলাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরটিভি/এমএইচজে