মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ , ০৩:০১ পিএম
শিক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তখন শৈশব হারায় অন্ধাকারে। নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এমনই এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে। নিজ মাদরাসা শিক্ষকের লালসার শিকার হয়ে ১২ বছরের এক শিশু এখন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরের বিকৃত যৌনাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছে শিশুটি, আর তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগে চিকিৎসকরা।
ভুক্তভোগী শিশুটির বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত 'হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (র.) কওমি মহিলা মাদরাসা'র পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর তাকে দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন করে আসছিলেন।
শিশুটি জানায়, টিফিনের সময় বা ছুটির পর তাকে মসজিদ ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিতেন হুজুর। এরপর মসজিদের ভেতরে বা মাদরাসার কক্ষে আটকে রেখে চলত পাশবিকতা। হুজুর মাঝখানে বসত আর আমাদের দুই পাশে বসাইত। বলত এটা আমার আম্মু, ওটা আমার বউ। গায়ে হাত দিয়ে বলত এগুলো আদর। চিৎকার করতে চাইলে মুখ চেপে ধরত। কাউকে বললে মারার ভয় দেখাত।
টাকার প্রলোভন এবং মামার কাছে বিচার দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘ দিন এই ঘটনা আড়াল করে রাখা হয়। জানা গেছে, শুধু এই শিশুই নয়, তার সহপাঠীও একইভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শিশুটির মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। বাড়িতে ফিরে মেয়ের শারীরিক পরিবর্তন দেখে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে জানা যায়, শিশুটি ২৭ সপ্তাহের (সাড়ে ৭ মাস) অন্তঃসত্ত্বা।
গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তার জানান, শিশুটির বয়স মাত্র ১২ বছর এবং উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম। তার ওজন মাত্র ২৯ কেজি। সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ বেশি হওয়ায় তার জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
ঘটনা জানাজানির পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর পলাতক। তবে আত্মগোপনে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি সমস্ত দায় অস্বীকার করে উল্টো শিশুটির পরিবারের দিকে আঙুল তুলেছেন। তার দাবি, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। এদিকে, মামলার দ্বিতীয় আসামি ও অভিযুক্তের ভাই মাইমুন ওরফে মামুন মিয়া বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামুন মিয়া মামলা না করার জন্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
এই ঘটনায় স্থানীয় আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় এক মাদরাসা শিক্ষক বলেন, একজনের অপরাধের দায় পুরো সমাজ নিতে পারে না। আমরা দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ইউপি সদস্য সোহেল রানাও অভিযুক্তের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, মামলা হওয়ার পর থেকেই আমরা আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি। সে পলাতক থাকলেও তাকে আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে কোনো প্রকার হুমকি দেওয়া হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (র.) মাদরাসাটি এখন বন্ধপ্রায়। যে শিক্ষক ও ইমামের ওপর এলাকাবাসী ভরসা করেছিলেন, তার এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে বাকরুদ্ধ পুরো উপজেলা। এখন দেখার বিষয়, আইনের হাত কত দ্রুত এই 'ভক্ষক' শিক্ষকের নাগাল পায়।
আরটিভি/এসকে