images

দেশজুড়ে

বন্যার ভয়ে ঘুম উড়ে গেছে চলনবিলের কৃষকদের

মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ , ০৬:০৮ পিএম

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়ার আগেই পাকা ধান ঘরে তুলতে দিনরাত কাজ করছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অংশের কৃষকরা। বন্যার পানি যাতে জমিতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য বিলের বিভিন্ন খালে অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণ করেছেন গ্রামবাসী।

চলনবিলে এবার ২৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন কৃষক জলিল প্রামানিক ইসলাম। গত সপ্তাহে মাত্র পাঁচ-ছয় বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছিলেন তিনি। এর মধ্যেই ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান কাটা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।

এদিকে, টানা বৃষ্টিতে আত্রাই নদীর পানি বেড়ে দাহাপাড়া এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রামবাসীরা নিজেরা মিলে মাটির অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানির চাপ আটকানোর চেষ্টা করছেন। 

কৃষক আবুল কাশেম জানান, আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া ভালো থাকলে বিলের সব ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

নাটোরে মৎস্য ব্যবসায়ী হত্যা: অস্ত্র উদ্ধার, স্ত্রী-সন্তানসহ ৪ জন আটক

তিনি বলেন, প্রতিবছর ধান কাটার পর বর্ষার পানি আসে। কিন্তু এবার ধান কাটার শুরুতেই আত্রাই নদীর পানি বেড়ে গেছে। তাই এখন আমাদের দিন কাটছে চরম দুশ্চিন্তায়।

রোববার (৩ মে) সকালে আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় কৃষকরা আবারও ধান কাটতে মাঠে নামেন। কাজ শেষ করতে অন্তত ১২ থেকে ১৩ দিন লাগবে। এ সময় পর্যন্ত আবহাওয়া শুকনো থাকা দরকার।

এ সংকট শুধু দাহাপাড়েই সীমাবদ্ধ নয়। আত্রাই নদীর পানি খালের মাধ্যমে বিলে প্রবেশ করায় সিংড়ার চলনবিলের পুরো অংশই এখন বন্যার হুমকিতে রয়েছে।

সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ  বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার টন। এটি দেশের অন্যতম বড় ধান উৎপাদনকারী উপজেলা। কিন্তু আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ১৪ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে কাজ অনেক পিছিয়ে গেছে। আত্রাই নদীর পানি বেড়ে খালে পানি ঢুকছে, যা যেকোনো সময় ক্ষেত ভাসিয়ে দিতে পারে বলে কৃষকেরা ভয় পাচ্ছেন।

বন্যার পানি ঠেকাতে স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ইতোমধ্যে জোরমল্লিকা, চৌগ্রাম ও শোলমারী এলাকায় তিনটি অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণ করেছে। জরুরি পরিস্থিতির মধ্যেও খরচ বাঁচাতে অনেক কৃষক কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতিতেই ধান কাটছেন।

সাতপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ ধান এক হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে কম। এখন যদি হারভেস্টার ব্যবহার করি, তাহলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। লাভের মুখ দেখতেই আমরা হাতে ধান কাটছি।

বিলের প্রায় ৬০ শতাংশ ধান এখনো মাঠে রয়ে গেছে। তাই আগামী দুই সপ্তাহ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকরা জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং অস্থায়ী বাঁধগুলো টিকলে সব ফসল নিরাপদে ঘরে তোলা যাবে। ধান কাটার এই পুরো মৌসুমে স্থানীয় কৃষি কার্যালয় নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন জানান, উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে গত কয়েক দিন ধরে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। শুধু গত তিন দিনেই অন্তত ৮ ফুট পানি বেড়েছে। 

আরও পড়ুন
Web-Image14

ইউএনও অফিসের কর্মকর্তাকে বেঁধে সরকারি কোয়ার্টারে ডাকাতি

তিনি বলেন, সোমবার (৪ মে) পর্যন্ত এই নদীর পানি বিপৎসীমার ২ দশমিক ৬৯ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

তিনি বলেন, সিংড়ার পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কারণ এই এলাকাটি বন্যার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। 

এ বিষয়ে সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল-রিফাত জানান, ইতোমধ্যে স্থানীয়দের সহযোগিতা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চলনবিলের মধ্যে পানি প্রবেশের যে পথগুলো রয়েছে সে পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

অফিসার আব্দুল্লাহ আরও জানান, এছাড়া তেলিগ্রাম, সুকাশ নিঙ্গুইন, বারুহাস এলাকায় ৩টি হারভেস্টার এবং আজকে আরও ২টি হারভেস্টার কৃষকের মাঝে দেওয়া হয়েছে দ্রুত ধান কাটার জন্য। আশা করছি আকাশের অবস্থা কিছুদিন ভালো থাকলে কৃষকেরা দ্রুত সময় তাদের ধান ঘরে তুলতে পারবে। 

আরটিভি/এমএম