শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ , ০৫:২৭ পিএম
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের টেটেশ্বর গ্রামে এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর অবশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)।
ডিএনএ পরীক্ষায় কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে তার কোনো মিল না পাওয়ায় আদালতে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। একইসঙ্গে ডিএনএ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, কিশোরীর সহোদর বড় ভাই মোরশেদই ওই সন্তানের জৈবিক পিতা।
পুলিশ জানায়, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এবং মোরশেদকে রক্ষা করতেই মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। দীর্ঘ তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর গত ১৭ এপ্রিল আদালতে দেয়া অভিযোগপত্রে মোজাফফরকে অব্যাহতি দিয়ে মোরশেদকে অভিযুক্ত করা হয়।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে মক্তবের পড়াশোনা শেষ করে ওই কিশোরী। ২০২৩ সালে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর পরিবার মক্তব শিক্ষক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। মামলার পরপরই মোজাফফর চাকরি হারান। ২৬ নভেম্বর তিনি মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে আদালতে গেলে সেখান থেকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন। ২৮ ডিসেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে আইনি লড়াই শুরু করেন।
এদিকে মামলার তদন্তে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মোজাফফরকে ঢাকার সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নেয়া হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষায় তার সঙ্গে কোনো ডিএনএ মিল পাওয়া যায়নি।
এরপর পুলিশ কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে স্বীকার করে, তার সহোদর বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন তাকে ধর্ষণ করে। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। একই বছরের আগস্টে কিশোরী, নবজাতক শিশু এবং মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিশুটির জৈবিক পিতা মোরশেদ। ডিএনএ প্রতিবেদনে তার সঙ্গে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।
এরপর তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শরীফ হোসেন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে মোজাফফরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি এবং মোরশেদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। বর্তমানে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী ইমাম মোজাফফর আহমেদ জানান, এ ঘটনা পর থেকে তিনি আর্থিক সামাজিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। জেল থেকে বের হবার পর অন্য কোন মসজিদে তিনি চাকরি পাননি।
মামলার খরচ চালাতে বিক্রি করেছেন বসতভিটা। কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া ঘটনার পর তার বাড়ি ঘরেও হামলা চালায় স্থানীয় এলাকাবাসীরা। তিনি প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান। পাশাপাশি তিনি সরকারের কাছে চাইলেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
মোজাফফরের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা বিরল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটিত হয়েছে।’
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “তিনি একজন মজলুম ইমাম। তার মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির দায় কে নেবে? তাকে আইনি ও আর্থিক সহায়তা দেয়া উচিত।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, “ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রকৃত অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর বড় ভাই। নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
আরটিভি/কেডি