শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ , ০৯:০৮ পিএম
মানিকগঞ্জে মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশী নামে এক ব্যক্তিকে মারধরের পর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, ৪০ হাজার টাকা না দেওয়ায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে আসলেই হত্যা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। ১০ জনকে আসামি করে সদর থানায় একটি মামলাও হয়েছে। এদিকে মামলা নিয়েও রয়েছে রহস্য।
শনিবার (৯ মে) দিনভর সরেজমিনে নিহতের পরিবার, প্রতিবেশী ও তরা বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিহত কৃষ্ণ রাজবংশী মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকার ক্ষুদিরাম রাজবংশীর ছেলে। তিনি বান্দুটিয়া বাজারের ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র, সিসিটিভি ফুটেজ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তরা বাজারের মাছের আড়ত থেকে তিন কার্টন চিংড়ি মাছ চুরি হয়। ওই ঘটনায় কৃষ্ণ রাজবংশীকে সন্দেহ করা হয়। বুধবার (৬ মে) ভোর ৫টার দিকে তাকে আটক করে বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী মারধর করেন। পরে একজনকে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিমের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও কৃষ্ণ রাজবংশীকে বাজার কমিটির কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়।
পরবর্তীতে তার স্ত্রী যমুনা রাজবংশীকে খবর দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাছ ব্যবসায়ী মেঘা ও তার সহযোগীরা যমুনাকে বাড়ি থেকে বাজারের সমিতি ঘরে নিয়ে যান। সেখানে যমুনার সামনেই তার স্বামীকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন।
পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে সালিশের নামে কৃষ্ণ রাজবংশীর স্ত্রীর কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা জোগাড় করতে স্ত্রীকে বাড়িতে পাঠান কৃষ্ণ। কিন্তু টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হলে দুপুর ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে আবারও মেঘা ও তার সহযোগীরা কৃষ্ণের বাড়িতে যান।
নিহতের স্ত্রী যমুনা রাজবংশীর অভিযোগ, টাকা দিতে না পারায় অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, এখন টাকা না পেলে মেরে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। এর কিছুসময় পরেই কৃষ্ণ রাজবংশীর আত্মহত্যার খবর পান তিনি।
যমুনা রাজবংশী বলেন, আমি বলছিলাম, যদি চুরি করে থাকে তাহলে আইনের হাতে তুলে দেন। কিন্তু তারা তা শোনেনি। আমার কাছে ৪০ হাজার টাকা চাইছিল। স্বামী বলছিল টাকা ব্যবস্থা করতে। আমি পারিনি। পরে তারা বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় বলে, টাকা না দিলে মাইরা ফেলতে হবে। এরপর বিকেলে শুনি সে নাকি গামছা দিয়ে ফাঁসি দিছে। কিন্তু তার কাছে কোনো গামছা ছিল না। সে আত্মহত্যা করার মানুষও না।
তিনি আরও বলেন, আমার দুইটা ছোট ছোট সন্তান। এখন সংসার চালানোর কেউ নাই। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।
মামলার ১০ আসামির সবাইকে তিনি চেনেন কি না জানতে চাইলে যমুনা বলেন, আমার তখন মাথা কাজ করতেছিল না। মেঘা আর আরেকজনকে চিনছি। বিচারের সময় বাজার কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারি আছিল। বাকিদের তেমন চিনি না।
ঘটনার পর তরা বাজার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তারা কিছু দেখেননি।
সেদিন দায়িত্বে থাকা নাইট গার্ড কবির বলেন, এমন মাছ চুরি মাঝেমধ্যেই হয় তবে এমন ঘটনা কোনোদিনও ঘটে নাই। আমার ডিউটি রাত ৪:২৫ পর্যন্ত ছিল, তবে ঘটনা তারও অনেক পরে ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চায়ের দোকানদার বলেন, মাছের আড়তের নতুন কমিটির গাফিলতির কারণে এমন হত্যা হয়েছে। আগে কখনও এমন হয়নাই নতুন কমিটি কবে কেমনে হলো তাও জানি না। এমন চুরির ঘটনা অনেক ঘটছে আগে তবে দুই চারটা চড় থাপ্পড় দিয়ে সরায় দিছে। পোলাটারে কয়েক দফায় মারধর করছে এমনভাবে মারধর করছে যা মর্মান্তিক।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার দিন তরা বাজারের আশপাশে বালুমহাল কেন্দ্রিক নিরাপত্তার কারণে পুলিশ টহলে ছিল। দুপুর পর্যন্ত এলাকায় পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি থাকলেও বাজার কমিটির লোকজন বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। তখন মরদেহ নিচে নামানো অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে কে মরদেহ নামিয়েছে, সে বিষয়ে কেউ স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।
এদিকে বাজার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাজার কমিটির কার্যালয়েও তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তরা মাছ আড়ত কমিটির সভাপতি হিসেবে জয়চাঁদ রাজবংশী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে খোকন রাজবংশী দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মামলায় সাবেক সভাপতির নামও এসেছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন বলেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএইচজে