images

দেশজুড়ে

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে নড়াইলের ‘প্রাণ’ চিত্রানদী

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ , ১০:৫৮ এএম

‘ক্রীড়া, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, চিত্রার কোলে নড়াইল সমৃদ্ধ’ এই স্লোগানটি কেবল নড়াইলবাসীর আবেগ নয়, বরং জেলাটির অস্তিত্বের মূলমন্ত্র। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের তুলিতে যে নদীর রূপ বারবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সেই প্রমত্তা চিত্রা আজ অস্তিত্ব সংকটের শেষ প্রান্তে। উজানের প্রবাহহীনতা, দখলদারদের আগ্রাসন আর দূষণের বিষবাষ্পে নদীটি এখন মৃতপ্রায় এক নালায় পরিণত হয়েছে।

এক সময় চিত্রা ছিল নড়াইলের অর্থনীতির ধমনী। প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা, যখন বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার আর পাল তোলা নৌকার আনাগোনায় মুখর থাকত নদীর দুই কূল। স্বচ্ছ জলরাশি আর গভীরতা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের অহংকার। কিন্তু কালের বিবর্তনে উজানের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই জৌলুস এখন অতীত। নদীটি আজ নিথর, নিস্তব্ধ।

নাব্যতা সংকটের সুযোগ নিয়ে নদীর বুকে থাবা বসিয়েছে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা। দুই কূল দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থায়ী পাকা স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ নদীর পাড়ে ১৩৯টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করলেও রহস্যজনক কারণে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থমকে আছে।

নদী দখল নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশিষ্ট সমাজকর্মী শরীফ মুনির হোসেন বলেন, চিত্রা নদী আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের পরিচয়। আমরা চোখের সামনে একটি জীবন্ত নদীকে তিলে তিলে মরতে দেখছি। অথচ প্রশাসনের ভূমিকা কেবল ফাইলবন্দি তালিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই উদাসীনতা নদীটির মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। অবিলম্বে কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান না চালালে পরবর্তী প্রজন্ম কেবল বইয়ের পাতায় চিত্রার নাম পড়বে।

এদিকে দখলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দূষণ। নড়াইল শহরের সমস্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে নদীতে। ফলে এক সময়ের সুমিষ্ট জলরাশি এখন দুর্গন্ধযুক্ত ওবিষাক্ত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর।

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

‘দুষ্টু’ এই মহিষের নাম ‘নেতানিয়াহু’

স্থানীয় জেলেরা জানান, বিষাক্ত পানির কারণে মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে এবং বহু দেশি প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদী দিয়ে জীবনধারণ করা শত শত জেলে পরিবার আজ দিশেহারা।

নদী রক্ষায় প্রশাসনের চরম উদাসীনতাকে দায়ী করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মাদ শাহ আলম বলেন, সরকার নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা করেছে, কিন্তু নড়াইলে তার প্রতিফলন নেই। প্রশাসন নামকাওয়াস্তে তালিকা করে দায় সারছে, বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। দ্রুত খনন ও উচ্ছেদ করা না হলে চিত্রা মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম অবৈধ দখলদারদের তালিকার সত্যতা স্বীকার করলেও, তা উদ্ধারে বা দূষণরোধে কোনো সুনির্দিষ্ট বা তাৎক্ষণিক পরিকল্পনার কথা জানাতে পারেননি। প্রশাসনের এমন দায়সারা বক্তব্যে জেলাবাসীর মনে আশার চেয়ে আশঙ্কাই বেশি দানা বাঁধছে।

নড়াইলের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক চিত্রা নদীকে বাঁচাতে এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন জেলাবাসী। তাদের দাবি অবিলম্বে নদী খনন করে পানির প্রবাহ ফেরানো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হোক। কারণ চিত্রা বাঁচলেই বাঁচবে নড়াইল, রক্ষা পাবে এ অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি ও সংস্কৃতি।

আরটিভি/এমএইচজে