বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ , ০৬:০৩ পিএম
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে সরকার। এ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধের পরও ছয় বছর ধরে পুরোপুরি চালু হয়নি। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের মাত্র একটি ইউনিট বর্তমানে আংশিকভাবে সচল রয়েছে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র শাহজীবাজার। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যান্ত্রিক ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও অগ্নিকাণ্ডে কেন্দ্রটির অধিকাংশ ইউনিট অচল হয়ে পড়েছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনই বাড়ছে সরকারের আর্থিক ক্ষতি।
২০১৭ সালে প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করে পিডিবি। ২০২০ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি।
পরবর্তীতে পরীক্ষামূলক চালুর পরই টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যায়। কয়েক দফা মেরামতের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আবারও ব্লেড ভেঙে গেলে পুরো কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। কিন্তু গত ছয় বছরে কেন্দ্রটি সচল ছিল মাত্র ৬৭ দিন। ফলে শুধু এই কেন্দ্র থেকেই সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকল্পে মোট বিলের প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা আটকে রেখেছে পিডিবি। যে টারবাইন ব্যবহার করা হয়েছে, তা আমেরিকার মতো দেশেও ব্যবহার হচ্ছে। এখানে কেন ত্রুটি হচ্ছে, তা বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করছেন।
অন্যদিকে ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। উদ্বোধনের আগেই একটি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যায়। পরে ২০২২ সালের ২৯ মে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাকি দুটি ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন পুরো কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে।
বর্তমানে একটি ইউনিট থেকে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সরকারের প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। তবে বাকি দুটি ইউনিট বন্ধ থাকায় প্রতিদিন আরও প্রায় ১৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য সাশ্রয় হারাচ্ছে সরকার।
শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, গত এক মাস ধরে একটি ইউনিট চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। বাকি ইউনিটগুলো চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ১৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত সাশ্রয় সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে উল্টো প্রায় ১৬ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের ঠিকাদার যদি কাজ না করে, তাহলে পিডিবি নিজেরাই সেই কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে ভাবছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে দুই কেন্দ্র মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সরকার। দীর্ঘ ছয় বছরের অচলাবস্থা, উৎপাদন বন্ধ, অগ্নিকাণ্ড ও মেরামত ব্যয় মিলিয়ে এ পর্যন্ত সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ সংযোজন করল রোসাটম
দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা শাহজীবাজার এখন অচলাবস্থা ও অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দ্রুত সব ইউনিট চালু না করা গেলে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
আরটিভি/এমএম