images

দেশজুড়ে

‘মা, তুমি ওগের টাকা দাও, নাইলে আমারে ছাড়বে না, মাইরা ফালাইবে’

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ , ১০:৫৪ এএম

লিবিয়া হয়ে অবৈধপথে ইতালি যাত্রায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছে মাদারীপুরের তরুণ সোহাগ মুনশি (২৪)। এমন মৃত্যু কোনভাবেই মানতে পারছে না তার পরিবার। ছেলেকে হারিয়ে বুকফাটা কান্না আর বিলাপ করছেন মা শাহিনুর বেগম। 

ছেলে সোহাগের সঙ্গে শেষ কথা স্মরণ করতে গিয়ে মা শাহিনুর বেগম বলেন, ‘মা, মাফিয়ারা আমাগো ধরছে, জুলহাস দালাল আমাগো বেঁইচা হালাইছে। মা, তুমি ওগের টাকা দাও, নাইলে আমারে ছাড়বে না, মাইরা ফালাইবে।’ ছেলেডা এ কথা কয়, আর পাশ থেকে কে জেনো ওরে মারতে থাকে। আমি ফোনে চিৎকার দিয়া খালি কইতাছি, বাজান তোমাগো হাতে-পায় ধরি, তোমরা আমার পোলারে মাইরো না, কিছু কইরো না। আমারে একটু সময় দাও। আমি তোমাগো টাকা দিয়া দিমু। কিন্তু ওরা আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইলো।

আহাজারি করতে করতে শাহিনুর বেগম বলেন, ১০ মাসে ধাপে ধাপে ৬০ লাখ টাকা দিছি, আরও ২৮ লাখ দাবি করছে। কিন্তু বাকি টাকা দিতে না পারায় ওরা আমার পোলারে মাইরা ফালাইছে। আমার ছেলেতো গেছেই, আমার ছেলের লাশটা ফিরাইয়া দাও। আমার বাবারে শেষবারের মত দেইখ্যা কী মরতে পারুম।

আমি ফোনে চিৎকার দিয়া খালি কইতাছি, বাজান তোমাগো হাতে-পায় ধরি, তোমরা আমার পোলারে মাইরো না, কিছু কইরো না। আমারে একটু সময় দাও। আমি তোমাগো টাকা দিয়া দিমু। কিন্তু ওরা আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইলো।

আরও পড়ুন
Web-Image24

ঋণের চাপে থাকা যুবকের করুণ পরিণতি

মাদারীপুরের রাজৈর পৌরসভাধীন মজুমদারকান্দি এলাকার কৃষক আশরাফ আলী মুনশির ছেলে সোহাগ লিবিয়াতে মারা গেছে গত শুক্রবার (২৪ জুলাই)। স্থানীয় দালালরা বিষয়টি গোপন রাখলেও গত বুধবার (২৯ জুলাই) রাতে লিবিয়াতে বসবাসরত মাদারীপুরের এক প্রবাসীর মাধ্যমে সোহাগের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে নিহতের বাবা ও বড় ভাই সুজন মুনশি।

পুলিশ, নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় আরও এক বছর আগে সোহাগকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করেন তার পরিবার। পরে মজুমদারকান্দির পাশ্ববর্তী শেখ বাড়ির মকিম শেখের স্ত্রী ময়না আক্তারের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। স্থানীয় দালালের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর চুক্তি হয় তাদের। চুক্তি মোতাবেক গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বাড়ি ছাড়ে সোহাগ। প্রথমে তাকে ঢাকা থেকে আকাশপথে নেওয়া হয় সৌদিআরব। পরে সেখানে কয়েকদিন রেখে তাকে পাঠানো হয় লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজিতে। বেনগাজি পৌঁছানোর পরে লিবিয়াতে বসবাসরত বাংলাদেশি দালালরা তার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলীর একটি বন্দিশালায় নেওয়া হয়। 

সেখানে প্রথম কয়েকদিন তাদের ভালো কাটলেও একমাস পার হলেই শুরু হয় নির্যাতন। দফায় দফায় মুক্তিপণের ৪৮ লাখ টাকা দালালের কাছে দিতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার পরিবার। একপর্যায় সোহাগকে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সবশেষ দালাল তাকে দেশে পাঠাতে আরও ২৮ লাখ টাকা দাবি করে। এই ২৮ লাখ টাকা চাওয়ার তিন দিনের মধ্যে দিতে না পারায় সোহাগের ওপর চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন। একপর্যায় দালালের বন্দিশালায় গত (২৪ জুলাই) মারা যায় সোহাগ। সোহাগের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে তার পরিবারের বইছে মাতম। 

আরও পড়ুন
Web-Image14

হত্যা মামলার আসামি লুকিয়ে ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে, ধানের গোলা থেকে গ্রেপ্তার

রাজৈর উপজেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নিহত সোহাগ মুনশির বাড়ি। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে ওই বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনসেড একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকেন সোহাগের মা-বাবা। বাড়ির উঠোনে প্রতিবেশী মানুষের ভিড়। মা শাহিনুর বেগম ও বাবা আশরাফ আলী মুনশি উঠোনে বসেই বিলাপ করছেন। ছেলে সোহাগের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে যাচ্ছেন। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

নিহতের ভাই সুজন মুনশি বলেন, দালালের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় আমাগো চুক্তি হয়। এই টাকার মধ্যেই সমুদ্র পার করে দিবে বলেছিল। লিবিয়া থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে গেম দেওয়ার কথা থাকলেও ওরে ৭ থেকে ৮ মাস আটরে রাখে। পরে দফায় দফায় মুক্তিপণের ৪৮ লাখ টাকা দিলেও ওরে ইতালিও পাঠাইলো না, দেশেও ফেরত পাঠাইলো না। দালালের নির্যাতনে আমার ভাই মইরা গেছে। যারা আমার ভাইর মৃত্যু জন্য দায়ী তাদের বিচার চাই।

সোহাগের বাবা আশরাফ আলী মুনশি ছেলের লাশ বাংলাদেশে ফেরত আনার দাবি জানিয়ে বলেন, আমার টাকাও গেল, পোলাও গেল। জমিজমা যা ছিল সবকিছু শেষ। আমার ছেলেরে তো আর ফেরত পাবো না। কিন্তু পোলার মরা লাশ দেখতে চাই। ওর লাশটা যেন সরকার দেশে আইনা দেয়, এইডাই চাই।

আরও পড়ুন
scl

প্রতিবন্ধীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন ভ্যানচালক সেলিম

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানবপাচার চক্রের সদস্য ময়না আক্তার রাজৈর উপজেলার স্থানীয় দালাল হলেও তিনি মূলত কাজ করেন জুলহাস সরদারের হয়ে। জুলহাস রাজৈর উপজেলায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ মানবপাচারকারী। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১০ মামলা রয়েছে। তিনি এই পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক তরুণ ও যুবককে অবৈধপথে ইউরোপ পাঠানোর কাজ করেছেন। তার অধিনে থাকা অন্তত অর্ধশত তরুণ এখনো নিখোঁজ। বর্তমানে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার জুলহাস সরদার কারাগারে রয়েছেন। জুলহাস রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের সত্যাবতী এলাকার আবদুল মজিদ সরদারের ছেলে।

এ বিষয়ে রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আমিনুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ার বন্দিশালায় এক তরুণের মারা যাওয়ার ঘটনায় নিহতের মা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এ ঘটনায় প্রধান আসামি জুলহাস কয়েকদিন আগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেবে। 

দালালদের ব্যাপারে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার এই প্রতিযোগিতা বন্ধে সকলকে সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

আরটিভি/এমএম