শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ , ০৮:১৩ পিএম
প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে অর্ধশতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সমন জারির আদেশ দেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় লেটার রাইটার শিহাব মৃধা ডাকঘরে আগত গ্রাহকদের সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে বিভিন্ন সময়ে সাদা স্লিপের মাধ্যমে ৫১ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। পরে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাজবাড়ী সদর আমলি আদালতে ভুক্তভোগীদের পক্ষে নাছরিন আক্তার দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন—রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, পিএলআই এজেন্ট মাহবুব মৃধা, লেটার রাইটার মাহবুবুর রহমান, পোস্টাল অপারেটর নাজমুল হাসান, ট্রেজারার পবিত্র কুমার সরকার, এমএলএসএস মো. রেজাউল আলম, পোস্টাল অপারেটর মো. গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, পোস্টাল অপারেটর এস এম নুরুজ্জামান, পোস্টাল অপারেটর আসমা আক্তার, প্যাকার কাম মেইল ক্যারিয়ার বিউটি রানী দাস, পোস্টাল কর্মচারী নুরুল মাসুদ ও রোকসানা আক্তার।
আদালত মামলাটি গ্রহণ করে অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে সমন জারির আদেশ দেন। বাদীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট অশোক কুমার ঘোষ।
জানা গেছে, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তে এসে ঘটনার মূল অভিযুক্ত লেটার রাইটার শিহাব মৃধাকে ডাকঘরে পেলেও তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন। তার বাড়িতে খোঁজ নিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বন্ধ রয়েছে তার মোবাইল ফোন।
বর্তমানে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা গত দুই সপ্তাহ ধরে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে এসে অর্থ ফেরতের দাবি জানাচ্ছেন। এ দাবিতে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশও করছেন।
অন্যদিকে, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অভিযোগে মূল অভিযুক্ত শিহাব মৃধাকে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠা পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রকে সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় বদলি করা হয়েছে।
এদিকে, গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ঘটনাটি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটিতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট (তদন্ত) সদস্য সচিব, ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল (তদন্ত), দক্ষিণাঞ্চল, খুলনা এবং কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়েছে।
কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিধি-বিধানের ঘাটতি বা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি হয়ে থাকলে তা সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, ২০২১ সাল থেকে শিহাব মৃধা হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি সরকারি কর্মচারী নন। ডাক অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের কর্মীরা বিভিন্ন ডাকঘরে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বলেন, অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রের পাসবই নিতে এসে বারবার না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
তিনি আরও বলেন, আমি গত ৬ জুলাই রাজবাড়ী ডাকঘরে যোগদান করেছি। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং সেখান থেকে খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। বর্তমানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ডাক অধিদপ্তর থেকে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/টিআর