বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ , ০১:১৬ পিএম
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে সরকার। আসন্ন নবম জাতীয় বেতনকাঠামোয় বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণে গ্রেডের পাশাপাশি এখন থেকে আয়, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্তরভেদে চাকরিজীবীদের বাস্তব চাহিদাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সব গ্রেডে প্রায় সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (বেতন বৃদ্ধি) দেওয়ার পদ্ধতি থেকে সরে আসছে সরকার। নতুন নিয়মের কারণে আসন্ন পে স্কেলে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে যাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এদিকে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় তোলার ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান নিয়মে সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামোর সব গ্রেডেই গড়ে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। তবে, নতুন বেতনকাঠামোর খসড়ায় শুধু ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে পঞ্চম গ্রেডে এ বেতন বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ রাখা হয়েছে। আর প্রথম গ্রেডের বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হবে আলাদাভাবে।
জানা গেছে, বেতন বৃদ্ধির নিয়মে এ পরিবর্তনের উদ্যোগের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের এ বিষয়ক একটি বিস্তৃত জরিপ। ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অংশ নিয়েছিলেন এ জরিপে, যার মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী চলমান বেতন বৃদ্ধির পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির হার সমন্বয়ের পক্ষে মত দেন। ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের সুপারিশ করেন। একইসঙ্গে আবার ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন আরও বেশি বাড়ানোর পক্ষে মত দেন।
গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট কয়েকটি কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ওই অতিরিক্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করা হয়। অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পরই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে মন্ত্রিসভায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বিবিএসের এই জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় তা ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা।
নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন। অন্যদিকে ২০তম গ্রেডের বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। সুপারিশ বিবেচনার দায়িত্বে থাকা সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন দেড় লাখ টাকা নির্ধারণের কথা ভাবছে। একইসঙ্গে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনও কিছুটা কমানো হতে পারে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১: ৮ করার সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন। তবেঁ, সচিব কমিটি তা আরেকটু কমিয়ে ১: ৭.৫ করার প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে এ অনুপাত ১: ৯.৪।
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী বেতন-ভাতা মিলিয়ে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে তা বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। ১৯তম থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্তও বিভিন্ন ভাতা বাড়বে। তবে, যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও ঝুঁকিভাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরটিভি/এসএইচএম