বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ১০:৩১ এএম
শূন্য থেকে পূর্ণ হওয়ার জন্য শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, তার পেছনে লাগে অদম্য চেষ্টা। যে চেষ্টার চড়াই-উৎরাই পথ বেয়ে পৌঁছানো যায় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে, সাফল্যের চূড়ায়। দেশ ও দশের জন্য কাজ করে ‘ইতিহাস’ হওয়া তেমনই এক ব্যক্তি স্যামসন এইচ চৌধুরী। নতুন প্রজন্মের উচিত তার বিখ্যাত উক্তি ‘সাফল্য অর্জনে কোনো শর্টকাট পথ নেই’ মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে বিরামহীন যাত্রা করা।
১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের আড়ুয়াকান্দিতে জন্ম স্যামসন এইচ চৌধুরীর। তার বাবার নাম ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী ও মায়ের নাম লতিকা চৌধুরী। বাবার ডাক্তারি পেশার সুবাদে শৈশব থেকেই স্যামসন এইচ চৌধুরী দীক্ষিত হয়েছেন মানবসেবার মন্ত্রে। ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করে তিনি বাবার মতো ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা, বিশেষ করে অনুজ চার ভাই ও দুই বোনের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা সম্ভব হয়নি।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান মুম্বাইয়ে। যোগ দেন রয়েল ইন্ডিয়ান নেভিতে। সেখানেই তার চরিত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্যটি উন্মোচিত হয়। প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি সিগনালিং শাখায় চাকরি না নিয়ে রাডার অপারেটর হওয়ার জন্য চার দিন কারাবরণ করেন, কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কর্তৃপক্ষ হার মানতে বাধ্য হয়।

দেশে ফিরে স্যামসন এইচ চৌধুরী পাবনার ডাক বিভাগে যোগদান করেন। কিন্তু তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী মন সেখানে বাঁধা পড়েনি। ডাক বিভাগের চাকরি ছেড়ে তিনি বাবার পরামর্শে ‘হোসেন ফার্মেসি’র দায়িত্ব নেন। এটি কেবল একটি ওষুধের দোকান ছিল না, এটি ছিল তার উদ্যোক্তা জীবনের প্রথম সোপান।
১৯৫৬ সালে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজ বাড়িতেই তিনি একটি ছোট ওষুধ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। নাম দেন ‘ইসনস্’ (Esons)। একমাত্র সহকারী হিসেবে পেলেন তার কর্মজীবনের সহযোদ্ধা, তার স্ত্রী মিসেস অনিতা চৌধুরীকে। ‘ইসনস্’ ছিল তার স্বপ্নের এক ক্ষুদ্র বীজ বপন; যা কঠোর পরিশ্রম ও প্রত্যয় দিয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল ‘স্কয়ার’ নামক বিশাল এক মহীরূহে।
১৯৫৮ সালে তিনি তার তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্কয়ার’। এই নামের পেছনে ছিল এক গভীর দর্শন। ‘স্কয়ার’-এর চারটি বাহু যেমন চার বন্ধুকে বোঝাতো, তেমনি এটি ছিল পরিপূর্ণতা ও শুদ্ধতার প্রতীক।
এ প্রসঙ্গে স্যামসন এইচ চৌধুরী সে সময় বলেছিলেন, ‘স্কয়ার মানেই পারফেকশন। এ জন্যই আমরা নাম রাখলাম স্কয়ার।’
প্রথম তিন বছর কোনো লাভ না হলেও তার অবিচল সাধনা স্কয়ারকে নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে। ১৯৮৫ সালে দেশের সব বহুজাতিক কোম্পানিকে পেছনে ফেলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস দেশসেরা হয়ে ওঠে এবং সেই অবস্থান আজও ধরে রেখেছে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ওষুধ ছাড়াও স্কয়ারের অন্যান্য পণ্যগুলোও আজ বাজারজাত করা হচ্ছে দেশের বাইরে।
ঔষধশিল্পে সাফল্যের পর স্যামসন এইচ চৌধুরী তার ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করেন। এরপর স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার টেক্সটাইলস, মিডিয়াকম লিমিটেড, অ্যাগ্রো-কেমিকেলস ও ভেটেরিনারি প্রোডাক্টস, স্কয়ার স্পিনিং, স্কয়ার নিট ফেব্রিক্স, স্কয়ার ফ্যাশনস, স্কয়ার কনজিউমার প্রোডাক্টস, স্কয়ার ইনফরম্যাটিক্স, স্কয়ার হসপিটালস ও মাছরাঙা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে একের পর এক নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেশের শিল্পখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
স্যামসন এইচ চৌধুরী শুধু ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েই তার কাজ সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাবার কাছ থেকে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে মানুষের সেবা করতে হয়, কীভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে হয়। আর সে কারণেই শুধু ব্যবসার জন্য নয়, একজন মানুষ হিসেবে স্যামসন এইচ চৌধুরী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছেন খাদ্য, ওষুধ, আর মুক্তিযুদ্ধের জন্য ফান্ড সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের দুই ছেলেসহ অনেকেই জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেন।
পাবনার আতাইকুলায় গরিব অসহায় এতিম শিশুদের জন্য একটি এতিমখানা গড়ে তোলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। সেখানে এতিম শিশুরা থাকা খাওয়াসহ জীবন গড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
এ ছাড়া তিনি পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি আধুনিকায়ন করেন। পাশাপাশি বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র, পাবনা প্রেস ক্লাবসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সহায়তা করেন।
একজন সফল শিল্পপতি হয়েও তিনি তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে কখনোই দূরে সরে যাননি। সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তিনি মুক্তহস্তে দান করতেন। মানুষের সেবা করাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তার ভিশন ও আদর্শকে তার উত্তরসূরিদের মধ্যে প্রবাহিত করতে পারা। তার সন্তানদের নেতৃত্বে স্কয়ার গ্রুপ শুধু ঔষধশিল্পে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখেনি, বরং তার দূরদর্শিতার ধারাবাহিকতায় একের পর এক নতুন খাতে নিজেদের প্রসারিত করেছে।

স্কয়ার হসপিটালসের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে তার মানবসেবার যে ব্রত কাজ করেছে, তার উত্তরসূরিরাও সেই একই আদর্শে সেবার মান নিশ্চিত করে চলেছে। তার দর্শন অনুযায়ী, ব্যবসা শুধু মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের স্কয়ার গ্রুপের প্রতিটি কাজে সেই প্রতিশ্রুতির ছাপ সুস্পষ্ট।
স্যামসন এইচ চৌধুরী ২০০১ সালে দ্য ডেইলি স্টার দি এইচ এল বিজনেস অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। পরে ২০০৩ সালে ‘মার্কেন্টাইল ব্যাংক অ্যাওয়ার্ড’ ও ২০১৩ সালে একুশে পদকসহ দেশ বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে।
জাগতিক সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান স্যামসন এইচ চৌধুরী। ৮৬ বছর বয়সে থেমে যায় তার জীবনঘড়ি। পরবর্তীতে ৭ জানুয়ারি তাকে পাবনায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শারীরিকভাবে না থেকেও স্যামসন এইচ চৌধুরী আজও আমাদের ভীষণভাবে বিরাজমান, থাকবেনও। যতদিন থাকবে চন্দ্র-সূর্য-তারা, পাখি গাইবে গান।
জন্মশতবর্ষে আরটিভি পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
আরটিভি/আইএম