সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ , ০৭:১৮ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটনকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এক সপ্তাহ ধরে তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, সেলিম রেজা নিউটন দীর্ঘদিন ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, লেখক ও জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে তিনি বহুবার সরব হয়েছেন।
২০২৪ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও হামলার অভিযোগ উঠছিল, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তার এই ভূমিকার কারণে তিনি ব্যাপক প্রশংসা যেমন পেয়েছেন, তেমনি পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণেরও মুখোমুখি হন। আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই তাকে এবং তার পরিবারকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অনলাইন হয়রানি, হত্যার হুমকি ও কুৎসা রটানো শুরু হয়, যা এখনও বিভিন্ন সময়ে অব্যাহত রয়েছে।
জানতে চাইলে সেলিম রেজা নিউটন বলেন, “আমার ইনবক্স ভরে গেছে হত্যার হুমকি, গালাগালি আর অশ্লীল বার্তায়। শুধু আমাকে নয়, আমার স্ত্রী, কন্যা, বোনসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়েও নোংরা ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এমনকি কোথায় থাকি, কোন পথে চলাফেরা করি - এসব খোঁজ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্যে পোস্ট করা হচ্ছে। এই অনলাইন আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সমন্বিতভাবে পরিচালিত একটি প্রচারণার অংশ, যার লক্ষ্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক ও মানসিকভাবে চাপে রাখা।
তিনি বলেন, আমার পরিবারের সদস্যরাও এই প্রচারণা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। আমার কন্যা, স্ত্রী, বোন - সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে গিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা হচ্ছে। তাদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে। ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা ধরনের সহিংস হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো শুধু অনলাইন ট্রল নয়; এগুলো মানসিক সন্ত্রাস। আমার পরিবারের জন্য এটা ভয়াবহ মানসিক চাপের বিষয়। একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রত্যাশা, এ ধরনের প্রকাশ্য সহিংস উসকানি ও হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নিউটনের অভিযোগ তার পরিবারের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে ফেসবুকে পোস্ট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোথায় থাকি, কার সঙ্গে চলাফেরা করি - এসব তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডক্সিং’ নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অনলাইন হয়রানি নয়, বরং বাস্তব জীবনে হামলা বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এসব হুমকি এবং সাইবার বুলিং করছেন নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারীরা। ফেসবুকে তাদের পরিচয় পাওয়া না গেলেও বেশিরভাগের ফেসবুক প্রোফাইলে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা বা ছাত্রলীগের লোগো দেওয়া। এতে বোঝা যায় তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।
নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিব জাকারিয়া বলেন, এগুলো খুবই সুপরিকল্পিত। আমি মনে করি যে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন তারা এই হ্যারেজমেন্টটা করছে। তারা নানাভাবে হ্যারেজ করার চেষ্টা করছে। নিউটনকে এভাবে হ্যারেজ করাটা বোকামির কাজ, খুবই নির্বোধের কাজ। নিউটন আজকালকের লড়াকু লোক না, সে সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। এটা কখনোই কাম্য নয়। রাষ্ট্রকে এই জায়গায় পৌঁছাতে হবে। আশা করি গভমেন্ট বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন এবং তার নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, যেকোন ধরনের নোংরামি সমর্থন করার কোন সুযোগ নেই। আমি যেকোনো মানুষের উপরেই যদি কোন সাইবার বুলিং হয়, যেকোনো মানুষকে যদি হত্যা হমকি দেওয়া হয়, সেটা কখনোই কাম্য নয়। আমরা ওইরকম একটা সমাজ কখনোই চাইনা। সেলিম রেজা নিউটন একটা ব্যক্তি নয় আমি মনে করি সে একটা প্রতিষ্ঠান। আমি এই বিষয়গুলোর নিন্দা জানাই। তার বিরুদ্ধে যারা এগুলো করছে সেগুলো ক্ষতিয়ে দেখা উচিত এবং শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমিও বিষয়টা ফেসবুকে দেখেছি। তবে তিনি কোনো অভিযোগ বা এধরণের কিছু আমাদেরকে জানাননি। এছাড়া সাইবার বুলিং একটা ওয়াইড এরিয়া, এখানে আসলে সুনির্দিষ্ট দোষীকে আইডেন্টিভাই করা কঠিন। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অভিযোগটা জরুরি। তিনি যদি অভিযোগ করেন তাহলে আমরা বিষয়টা দেখতে পারি। দেশের বাহিরে বা অন্য কেউ হলে সেক্ষেত্রে আমাদের তো সেই মেকানিজম নাই। তাকে কে কোথা থেকে কি বলছে তা বের করা আমাদের জন্য কষ্টকর। তবে তিনি সাহায্য চাইলে আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করবো।
আরটিভি/ এসকেডি