বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ০৮:৪০ পিএম
জ্ঞান অর্জনের ধারক-বাহকের অন্যতম মাধ্যমগুলোর একটি— ‘বই’। বইয়ের পাতা ইতিহাস-ঐতিহ্য, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, মূর্খতা-শুদ্ধতা ও আলো-আঁধার ফারাকের জীবন্ত সাক্ষী। যেমনটি জ্ঞান মানুষের জীবন ও পথচলার খোরাক, তেমনি বইপোকা জ্ঞানপিপাসুদের পথচলার পাথেয় হচ্ছে বই আর লাইব্রেরি। একইসঙ্গে বইপ্রেমীরা অনেকেই পারিবারিক ও ব্যক্তিগত লাইব্রেরিও গড়ে।
কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে জ্ঞানার্জনের মাধ্যম সহজ হওয়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বই থেকে যোজন-যোজন দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে মিথ্যার মায়াজালে ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে বইপ্রেমীদের সংখ্যা। একদিকে অনলাইন ও ফেসবুকমুখী শিক্ষার্থীরা অযাচিত সময় পার করছে, অন্যদিকে লাইব্রেরিতে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের দেখা মেলা ভার। স্মার্ট যুগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা ছাড়া বইয়ের সাথে জুতসই সম্পর্ক রাখে না বললেই চলে।
শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভাস গড়ে তুলতে ও বইপোকা জ্ঞানপিপাসুদের নতুন করে বইপ্রেম জাগ্রত করতে ব্যতিক্রমী নিয়মিত আয়োজন করে যাচ্ছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) স্বেচ্ছাসেবী ও অরাজনৈতিক সংগঠন ‘তারুণ্য’। শিল্প-সাহিত্য সহজলভ্যকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ভবনের সামনে সবচেয়ে বড় আমেজপূর্ণ আড্ডার কেন্দ্রস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় গত ২০১৯ সালে ২০ মার্চে ভ্রাম্যমাণ ‘তারুণ্য লাইব্রেরি’ গড়ে তুলেছিল সংগঠনটি। যদিও ‘অবারিত সম্ভাবনা নিয়ে জাগ্রত তারুণ্য’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই যাত্রা শুরু করে ‘তারুণ্য’।
সংগঠনটির নির্দিষ্ট নিয়মমাফিক সদস্যসহ সবার জন্য উন্মুক্ত পরিবেশে প্রতি বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ‘ভ্রাম্যমাণ তারুণ্য লাইব্রেরি’ কর্মসূচি পালন করে আসছে। যা প্রতিনিয়ত বটতলায় আলো ছড়াচ্ছে। তারুণ্যের সদস্যসহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী সহজে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে ‘তারুণ্য লাইব্রেরি’ থেকে বই আদান-প্রদান করতে পারে। রয়েছে বটতলায় বসে বসে বই পড়ার যথেষ্ট সুযোগও।
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে তারুণ্যর শক্তিকে কাজে লাগানো, তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবসম্পন্ন করে গড়ে তোলা, নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, শিল্প ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গঠনে বইপাঠ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অংশগ্রহণ, বনায়ন, রক্তদান, শীতবস্ত্র বিতরণ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতাসহ নানাবিধ সামাজিক কাজ করে যাচ্ছে ‘তারুণ্য’।
সরেজমিনে বইপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বই বাসায় নেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রায় লাইব্রেরিবিমুখ। তারুণ্য ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে সহজে বই আদান-প্রদান করতে পারে। পুরো সাপ্তাহ জুড়ে আড্ডার মধ্যে সময় কাটলেও প্রতি বুধবার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা চাইবো যারা বইপ্রেমী তারা যেন বই উপহারের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র লাইব্রেরিটা আরও বৃহৎ পরিসরে গড়ে তোলার সহযোগিতা করেন।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফারহানা আইরিন মণি জানান, জ্ঞানচর্চার প্রসার, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি উন্মুক্ত পাঠের পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে এই লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে লাইব্রেরিটিতে প্রায় ১,৫০০টি বই রয়েছে, যেখানে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য, উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, দর্শন, আত্মউন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে। নিয়মিত নতুন বই সংযোজনের মাধ্যমে লাইব্রেরির সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ তরুণদের মধ্যে সৃজনশীল চিন্তাশক্তি, মানবিক মূল্যবোধ এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘তারুণ্য’ একটি ‘লাইব্রেরি ভ্যান’ চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
‘তারুণ্যে’ সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি ইমন বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে অন্যান্য বই পড়তে যথেষ্ট অনাগ্রহ দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতি বুধবার বই প্রেমীদের আড্ডায় মেতে ওঠে বটতলার ব্যস্ততম জায়গাটি। সেখানে ওইদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন পাঠক বই আদান-প্রদান করে থাকে। সদস্যদের বই পড়ায় আগ্রহ সৃষ্টি করতে প্রতিমাসে সাহিত্য আড্ডা ও বুক রিভিউ এর আয়োজন করা হয় এবং সর্বোচ্চ বুক রিভিউ-কারীকে পুরস্কৃত করা হয়। আশা করি ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝে লাইব্রেরিটির বইয়ের আলো পৌঁছে যাবে।
আরটিভি/এমএম