images

মুক্তমত

পুঁজিবাদের দাপট বনাম শ্রমের অধিকার: শ্রম আইন কি শুধু কাগজে-কলমে?

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ , ১০:২১ পিএম

দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের ঘামে ও পরিশ্রমে। কারখানা থেকে হাসপাতাল, নির্মাণ খাত থেকে উদীয়মান প্রযুক্তি খাত-সবখানেই শ্রমিক ও কর্মজীবীদের অবদান অনস্বীকার্য। সহজ কথায়, একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার আসল কারিগর তারাই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিপুল অবদানের বিপরীতে তারা কি যথাযথ মর্যাদা, ন্যায্য পাওনা ও আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন?

অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স তাঁর তত্ত্বে শ্রমকে উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু পুঁজিবাদের আগ্রাসী বিকাশে অনেক সময় শ্রমিকের এই শ্রম চরমভাবে অবমূল্যায়িত হয়। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশেও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, আত্মমর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমান সময়ের নানামুখী শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রমিকের অধিকার রক্ষা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। একজন কর্মীর কাছ থেকে নিষ্ঠা ও দক্ষতা প্রত্যাশা করা যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়াটাও তাঁর মৌলিক অধিকার।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেমন-বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা (১০০ ও ১০২) অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের দৈনিক কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা এবং ওভারটাইমসহ তা কোনোভাবেই ১০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। একইভাবে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হবে ৪৮ ঘণ্টা, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে ওভারটাইমসহ সর্বোচ্চ ৬০ ঘণ্টা হতে পারে। এমনকি আইন অনুযায়ী (ধারা ১০৮), নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে কাজ করালে শ্রমিককে তাঁর স্বাভাবিক মজুরির দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম বা পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য প্রতিদান নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান দেশের প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করে নিজস্ব বিধিমালা তৈরি করে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন স্পষ্ট বলে—কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিধিমালা বা সেবাশর্ত শ্রম আইনের চেয়ে কম সুবিধাজনক হলে বা শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে, সেই বিধান আইনের দৃষ্টিতে কার্যকর বলে গণ্য হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে এবং শ্রম আইনের বিধানই প্রাধান্য পায়।

আরও পড়ুন
mnc

মাসিককালীন স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি

দুর্ভাগ্যবশত, এই সুস্পষ্ট আইনি মনোভাব থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত খাটুনি, যথাযথ ওভারটাইম না দেওয়া কিংবা অভ্যন্তরীণ মারপ্যাঁচে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করার নীতি বজায় রেখেছে। ফলে জনগণের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—শ্রম আইন কি তবে কেবলই কাগজে-কলমে, এর বাস্তব প্রয়োগ কোথায়?

মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু মজুরি কিংবা কর্মঘণ্টা নয়, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি মুক্ত রাখা, নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও আইনি বাধ্যবাধকতা। আধুনিক শ্রম ব্যবস্থায় এটি কোনো মালিকপক্ষের ‘দয়া বা সদিচ্ছা’র বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের একটি মৌলিক শর্ত।

পাশাপাশি, একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার জন্য শ্রমিকের অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠার মানবিক স্বীকৃতি হিসেবে নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতি কর্মীদের উৎসাহ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে এটি উত্তম মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি কেবল আর্থিক প্রণোদনা নয়, বরং কর্মীর প্রতি প্রতিষ্ঠানের সম্মানের প্রতিফলন। যথাসময়ে ন্যায্য ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হলে কর্মীদের মনোবল বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানেরই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।

কার্ল মার্ক্স শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বকে ইতিহাসের এক মৌলিক বাস্তবতা হিসেবে দেখিয়েছেন। তবে আধুনিক কল্যাণমুখী অর্থনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই দ্বন্দ্বকে সংঘাতে রূপ নিতে না দিয়ে সহযোগিতার আবহে রূপান্তর করা। কারণ, শ্রমিক ও মালিক কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়; বরং তারা একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের পরস্পর নির্ভরশীল দুটি শক্তি। অতএব, শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপভিত্তিক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলাই হোক একটি টেকসই, মানবিক ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি।

লেখক: এলএলবি (অনার্স) চতুর্থ বর্ষ, বাংলাদেশ ওপেন ইউনিভার্সিটি।

আরটিভি/ এসকেডি