images

মুক্তমত

বিএনপির সরকার: জামায়াতের গাত্রদাহ ও আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন সম্ভাবনা

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ , ১২:৫৮ এএম

গত নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপি যখন জামায়াতকে সরকারের অংশ করতে অস্বীকার করে, তখন থেকেই জামায়াত বিএনপির পিছনে লাগা শুরু করে। বস্তুত: নির্বাচন বানচাল কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার আন্দোলন হালে পানি না পাওয়ায়ে এনসিপি-জামায়াত নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়। এই দুই দলের লক্ষ্য ছিল ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিবিধগুলোকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ন রাখা। প্রকৃতপক্ষে সেসময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তরালে এনসিপি-জামায়াতই ক্ষমতায় ছিল এবং তাদের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। এই ব্যবস্থা যে অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না, সেটা বুঝেও তারা চেষ্টা করেছে যতদিন সম্ভব এটিকে টেনে নিয়ে যেতে। সে প্রচেষ্টার শেষে তারা ড. আলী রিয়াজের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্তকরণ ও তা বাস্তবায়নের আদেশ জারি করে- যা আইন বহির্ভূত তো বটেই, জালিয়াতিতে পরিপূর্ণ ছিল বলে বোদ্ধাজনেরা মনে করেন। 

নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জামায়াতের আমির বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে সরকারের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলেও জনাব তারেক রহমান তাতে সম্মত হননি। এতে ক্ষুব্ধ এনসিপি-জামায়াত নির্বাচনের পরদিন থেকেই এই নবনির্বাচিত সরকারের পতনের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। সরকার গঠনের পরদিন থেকে শুরু হওয়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা সত্য-মিথ্যা নানা বিরোধিতা দিনে দিনে শুধু বেড়েই চলেছে, এই ক্যাম্পেইনের থেমে যাওয়া বা এর গতি কমারও কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে খেলে। মূলদল ছাড়াও এনসিপি, এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ পার্টি নামের সংগঠন যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে ‘দেশের সাধারণ জনগণ’, ‘সাধারণ মানুষ’, ‘ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক’ প্রভৃতি নানা ফোরাম। যেকোনো নতুন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন নামে নতুন অ্যাজেন্ডা নিয়ে হাজির হচ্ছে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। আর তাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবের জায়গা- সামাজিক মাধ্যম তো রয়েইছে।

এই সব ফোরামে নানা ইস্যু ও নন-ইস্যু নিয়ে তারা মাঠ গরম করার পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিএনপির নবগঠিত সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলা যাতে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটা দাবি তুলতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো বিএনপির সরকার অতীতের রেকর্ড ভেঙে নির্বাচনের পরও শুধু জনপ্রিয়তা ধরেই রাখেনি, তাদের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এর সিংহভাগ কৃতিত্ব দলের শীর্ষ নেতা জনাব তারেক রহমানের জনগণের সাথে মিশে যাওয়া এবং সরকারের কার্যক্রমকে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। সংসদ সদস্যদের জন্য করমুক্ত গাড়ি ক্রয়ের বিধান বাতিল, রাজউকের প্লট না নেবার ঘোষণা প্রভৃতির মাধ্যমে জনাব তারেক রহমান জামায়াতকে ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য করেছেন। তারা নির্বাচনের আগে গাড়ি, প্লট বা ফ্ল্যাট না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যখন দেখতে পাচ্ছে যে এই সব সুবিধা প্রকৃতপক্ষেই আর পাওয়া যাবেনা, তখন তার এর বিকল্প হিসাবে সরকারি গাড়ি, অফিস এমনকি বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে মাইক্রোওয়েভ ওভেন, পর্দা, ওয়াশিং মেশিনের মতো সামান্য ইনিসের জন্য সংসদে দাবিনামা পেশ করছেন। এসব যে প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়ার হতাশা/বেদনা থেকে আসছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আরও পড়ুন
Web-Image14

নতুন সরকার, নতুন বন্দোবস্ত!

জামায়াতে ইসলামী এদেশে কখনোই রাজনীতির মূল খেলোয়াড় ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তারা বড় দুটি রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে থেকেছে। সে সময়গুলোতে তারা বড় এই দুই দলের ছত্রছায়ায় থেকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সহায়ক হিসাবে কাজ করেছে এবং গোপনে নিজেদের দল সংগঠন করেছে। সেই হিসেবে তারা যুগপৎ আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য লাভ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। জামায়াতে ইসলামী ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বর্তমানে উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রে সক্রিয় রয়েছে। ভারতে তারা একটি দুর্বল প্রেসার গ্রুপ ছাড়া আর কিছু হতে পারেনি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তাদের সংগঠন জাতীয় রাজনীতিতে একটা অবস্থান নিলেও তারা এই দুই দেশেই মোটামুটি আউটসাইডার হিসেবেই এতদিন অবস্থান করেছে।

১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৫ শতাংশের কম ভোট পেয়েছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রায় ১২ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল। আর সংসদের ১৭টি আসনে জয় পেয়েছিল। এক হিসাবে এটি জামায়াতের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করলে তাদের ভোট আবার ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়; সেবার তার মাত্র ৩ টি আসনে জয় লাভ করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তারা বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হিসাবে নির্বাচন করলে তাদের প্রাপ্ত ভোটার হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও তার ১৮ টি আসনে জয়ী হতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানে তাদের অবস্থা এর চেয়েও খারাপ। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার ২ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেলেও তারা পার্লামেন্টে কোনও আসন পায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে এবার ২০২৬ এর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট ও ৬৭টি (তাদের অন্য প্লাটফর্মগুলিসহ মোট ৭৭ টি) আসনে জয় পাওয়ার পর তাদের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বলে সন্দেহ হয়। তারা এটা বলবার চেষ্টাও করছেন যে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল দেশের মানুষের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে নাই; কিন্তু এর মাধ্যমে তারা যা বুঝাতে চাচ্ছে, বাস্তবতাটা হলো ঠিক তার বিপরীত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের একটি অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনগুলিতে তারা ৩১-৩৫ শতাংশের মধ্যে ভোট পেয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে শেখ হাসিনার ক্ষমতার প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার স্বজনপ্রীতি ও অর্থের প্রতি তীব্র লোভের কারণে আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। বস্তুত: শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের সদস্যদের এই দেশটার প্রতি কোনো মমতা বা ভালবাসা ছিলো না। তিনি তার পিতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এবং তার ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য আমাদের দেশটাকে বেছে নিয়েছিলেন মাত্র। আর তাকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত তাদের নানা অন্যায্য সুবিধা আদায়ের ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহারের জন্য। শেখ হাসিনার শাসনামলের সাড়ে পনেরো বছরে তিনি ও তার আত্মীয়-স্বজন এবং তার দলের মাফিয়ারা দেশটাকে সাক্ষাৎ নরক বানিয়ে ফেলেছিল। এসময়ে তিনি ও তার লোকজন দেশ থেকে ৩২৪ বিলিয়ন ডলার শুধু বিদেশে পাচারই করেছে। তাছাড়া ব্যাংক লুট, বাবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, গুম-খুনের মাধ্যমে দেশ থেকে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে রাখা, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ, কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে না দেওয়া প্রভৃতি কারণে শেখ হাসিনা ও তার দলের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমে আসার পর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা থেকে অপসৃত হন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত তাদের জন্য অভাবনীয়ে সাফল্য পায়।

বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অন্যান্য দেশের রাজনীতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। উপমহাদেশের অপর দুইটি দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিই মূল রাজনীতি হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। এদেশে নেতৃত্বই যে শুধু কোনও একক পরিবার থেকে আসে তা না, এদেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও পরিবার পরম্পরায় একই দলের রাজনীতি করে অভ্যস্ত। খুব বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে এদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন করে না। গত গণ-অভ্যুত্থানে সে ধরনের একটা বিশাল ঘটনা। গণ-অভ্যুত্থানের পরে দেশের আওয়ামি লীগ সমর্থকদের একটা অংশ তাদের রাজনীতি ও সমর্থনের দল পরিবর্তনের চিন্তা ও চেষ্টা করে। যারা আওয়ামী ভাবধারার রাজনীতিতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য জামায়াত কোনও অপশন না। তারা বিকল্প হিসাবে এনসিপি এবং বিএনপিকে নিয়ে ভেবেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এনসিপির নেতৃত্বের অপরিমেয় লোভ-লালসা, চাঁদাবাজি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, দখলদারি, মব-সন্ত্রাসের কারণে তারা জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা দ্রুতই হারিয়ে ফেলে। আর জামায়াতের মিথ্যাচার ও মুনাফেকি নির্ভর রাজনীতিতো বটেই, ক্ষমতার সব কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা এবং সব কিছু গ্রাস করে ফেলার প্রবণতার কারণে ভয় পেয়ে অনেক আওয়ামী লীগারই বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। আর যারা এনসিপি-জামায়াতকে ভোট দিয়েছে, তারাও তাদের ভুল এখন বুঝতে পেরেছে। 

বিবিসির সাথে সাথে সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন যে বাংলাদেশে দুটি বিষয় 'Non Negotiable', যার একটি হলো ইসলাম এবং অপরটি হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে জনাব রাজ্জাকের এই উপলব্ধিটাকে আমার কাছে সঠিক ও শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি বলে মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় স্বয়ং জামায়াতই বিষয়টিকে আমলে নেয়নি, যার কারণে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে দল ছাড়তে হয়। বাংলাদেশে রাজনীতি রাজনীতিকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে যেয়ে যেমন নিজেদেরকে হাস্যস্পদ করে ফেলেছিল, তেমনি জামায়াত ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলেছে। আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যাচার, অপরিসীম লোভের কারণে তারা দেশের মানুষের আস্থার জায়গাটা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া তাদের দলে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত লোকেরও খুব অভাব রয়েছে। বিশেষ করে এবারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এমন সব মানুষ রয়েছেন, যারা সংসদ বিষয়টিই না বুঝে উল্টাপালটা বক্তব্য দিয়ে নিজেদের আরও খেলো করে তুলছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যেমন ভারত-নির্ভর রাজনীতি করতে যেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তেমনি জামায়তও অতি পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির চর্চা করতে যেয়ে গত গণ-অভ্যুত্থানকালের নিজেদের অর্জনগুলিকেও হারিয়ে ফেলার উপক্রম করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির দল বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে বিএনপি এই মুহূর্তে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে থাকার কারণে, এবং জামায়াত দায়িত্বশীল বিরোধীদলের স্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ভারত ও কিছু পশ্চিমা দেশ এদেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে। বিএনপিও এবিষয়ে একমত। বিএনপি মনে করছে এদেশে বিএনপি ছাড়াও একটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল থাকা প্রয়োজন যারা প্রয়োজনে বিকল্প হিসাবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব একটা বিরাট প্রতিবন্ধকতা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি ‘মেগালোমনিয়াকে’ পরিণত হয়েছেন যে তিনি তার চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সব কিছুকেই সন্দেহ ও পরিত্যাজ্য বিবেচনা করেন। বস্তুত: তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফলে তিনি অনিরাময়যোগ্যভাবে মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়েছেন এবং সাইকোটিক হয়ে গেছেন। এরপর তার স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা করার যেটুকু ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিলো, লোভী-চাটুকারেরা মোসাহেবির মাধ্যমে তার সে ক্ষমতাটুকুকেও নিঃশেষ করে ফেলেছে। 

গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে লজ্জাজনকভাবে ক্ষমতাচ্যুতি ও পলায়নের পর তার নিজের ও তার দলের কর্মকাণ্ড নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগের ও এর নেতৃবৃন্দের দোষ-ত্রুটিগুলোকে চিহ্নিত করে সেজন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা দরকার ছিলো। রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে দেশের মানুষের সাথে সংঘটিত অন্যায়-অপকর্মগুলির জন্য অনুতাপ না করলে দেশের মানুষ কেন তাদেরকে ক্ষমা করবে বা আবার আস্থায় নেবে? কিন্তু আত্মম্ভরি শেখ হাসিনা সেসবের দিকে যাননি। তিনি মনে করছেন তার সময়ে প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয়ে করা উন্নয়ন কাজের জন্য দেশবাসী তাঁকে আবার গ্রহণ করবে! কী নিদারুণ দিবাস্বপ্ন! বস্তুত: শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে থাকাকালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কখনোই মূল খেলোয়াড় হতে পারবে বলে মনে হয় না। গত দুই দশকে যেভাবে আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ারও কোনও সুযোগ ছিলো না। ফলে বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো ব্যক্তি ওই দলে নাই। তাছাড়া শেখ হাসিনার সাথে তার দলের সব চোর-বাটপারও পালিয়ে গেছে। তারা এখন বিদেশের মাটিতে বসে দেশের সরকার ও গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের মানুষদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, যা তাদের প্রতি দেশের মানুষের ভীতি ও বিতৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। দেশে অবস্থানরত তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে টাকার বিনিময়ে রাস্তায় চোরাগোপ্তা মিছিল করে ভাবছে আওয়ামী লীগকে দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে। ঢাকা বা দেশের বিভিন্ন শহরের রাজপথে ৫০-১০০ জনের মিছিল শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনবে, এই চিন্তাটা শুধু বালখিল্যই নয়, দিবাস্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু।

এনসিপি-জামায়াতের অস্থিরতা এবং অহর্নিশ ষড়যন্ত্রের কারণে অনেকে মনে করেন যে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিএনপির গত নির্বাচনি ইশতেহারেও সে বিষয়ে একটি পথ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বিষয়টি বিএনপি বিবেচনা করবে প্রয়োজন অনুভব করলে, এবং তা হবে বিএনপির জন্য সুবিধাজনক সময়ে। কিন্তু কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা এবং দেশের মানুষের আস্থাভাজন না হয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলে তা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না, বরং তা তাকে অবশ্যম্ভাবী বিলুপ্তির দিকেই ঠেলে দেবে।
ঢাকা

লেখক: নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরটিভি/এমএইচজে