নতুন সরকার, নতুন বন্দোবস্ত!

জিয়া আহমদ 

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০২:১৯ পিএম


নতুন সরকার, নতুন বন্দোবস্ত!
জিয়া আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। এই নির্বাচনটির তাৎপর্য অনেক গভীর। ২০০৬ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বানচাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে একটি নীলনকশার নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ডিপস্টেট ও অন্যান্য কুশীলবেরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেয় ২০০৯ সালে। তারপর পনেরো বছরের জন্য দেশের কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে এক ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা। অবশেষে ২০২৪ সালের এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন একটি নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হয়। কিন্তু সে পথও রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের একক কৃতিত্বের দাবিদার একটি পক্ষের নানান অন্যায় আবদারে। তারা নতুন বন্দোবস্তের নামে দেশে সবচেয়ে প্রাচীন শাসন বাবস্থা চাপিয়ে দিয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, পদ-ব্যবসা, চাঁদাবাজির এক মহোৎসবে মেতে উঠে। ফলে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়। সে প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতৃত্বে দেশের জনগণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে একাট্টা হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঘোষণা করে। নির্বাচন বানচাল ও নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার নানা ষড়যন্ত্রকে অতিক্রম করে অবশেষে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

২০২৪-এ স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর যখন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশিত ছিলো, তখন দেশেরধর্মাশ্রয়ীই রাজনৈতিক দল ও গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্ররা ‘ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাব রোধের জন্য বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন’ শীর্ষক বয়ান নিয়ে মাঠে নামেন এবং নির্বাচনকে পিছিয়ে দেয়। তাদের যুক্তিটা ভালো হলেও তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে তাদের দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সচিবালয়সহ দেশের সব কয়টি গুরুত্বপূর্ণ অফিসে তাদের কর্মী ও অনুসারীদের নিয়োগ ও বদলি করে আনা শুরু করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সদ্যপ্রাপ্ত ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী নাম নিয়ে কিছু তরুণ সচিবালয়সহ সারা দেশে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজি শুরু করেন। কোনকিছু তাদের মনমতো না হলেই তারা মবসৃষ্টিসহ নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নায্য-অনায্য দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে থাকেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশের সুবিধাবাদী নানা পেশাজীবীরাও তাদের অন্যায় দাবি আদায়ে একইপথ অবলম্বন করেন। দুর্বল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এদের এইসব অন্যায় দাবি মেনে পরবর্তী সরকারের ওপর আর্থিক দায় সৃষ্টি করতে বাধ্য হন।

নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর এই ধরনের মব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যারা এই মবকে ব্যবহার করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের জন্য এই বাস্তবতাটা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। তাদের চাঁদাবাজির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ এখন বাতিল হয়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে তাদের টাকা-পয়সা ও সদ্যলব্ধ আরাম-আয়েশের জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেবে। কেউ কেউ তো এখনই চাকরি খোঁজার নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করা শুরু করেছেন। তাছাড়া নানা উদ্ভট বক্তব্য দিয়ে যারা দেশের মিডিয়াতে সবসময় স্থান দখল করে থাকতেন, তাদের জন্য এখনকার নিস্তরঙ্গ সময়টাকে হজম করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে রাজত্ব করেছেন দীর্ঘদিন। তারা বুঝে-না-বুঝে সামাজিক মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এমন একটা বিভ্রমের সৃষ্টি করেছিলেন যে, তারা তো বটেই, সাধারণ মানুষেরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে ভবিষ্যৎ সরকার জামায়াতেরই হয় কিনা, এই ভেবে। তবে এনসিপি ও জামায়াতের ধূর্ত অংশটা, যারা বিএনপির জয়লাভের বিষয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. আলী রিয়াজের মাধ্যমে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসাবে একটা ঝামেলা পাকিয়ে রাখেন, যেটা হলো গণভোট। 

বিজ্ঞাপন

519d7a05-bb98-4c51-b995-88b7943cceed

দীর্ঘ ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা প্রায় ৩০টি দলের সাথে আলোচনা করে, তাদের ‘নোট অফ ডিসেন্ট’গুলোকে সন্নিবেশিত করে যে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করেন, স্বাক্ষরের সময় প্রতারণার মাধ্যমে তাকে বদলে দিয়ে, ‘নোট অফ ডিসেন্ট’গুলোকে নিশ্চিহ্ন করে, ‘জুলাই সনদকে’ চূড়ান্ত করেন। বর্তমানে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এটা প্রত্যাশিত যে বিএনপি সরকার তার আপত্তির জায়গাগুলো বাদ দিয়েই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। জনগণের সরাসরি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এনসিপি ও জামায়াত এই বিষয়টিকে নিয়েই রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করবে। তাদের সে প্রচেষ্টা  সফল হোক বা না হোক, তারা রাজপথ্যকে গরম করার চেষ্টা যে করবে, তা বলা যায় নিঃসন্দেহে। 

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সামনে থাকা তরুণেরা, যারা আন্দোলনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ডিবি হারুনের কারাগারে আটক ছিলো, তারা এই গণ-অভ্যুত্থানের ভেতরের সংগঠন ও তার অন্তর্গত টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সম্বন্ধে তেমন অবগত নয়। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম না করা এই ছেলেরা ‘ফোকটে’ নেতা বনে  গিয়েছে। রাজপথে আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তার সময়ের প্রয়োজনেই নেতৃত্ব তাদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। যেহেতু তারা কোনও ‘স্ট্রাকচার্ড আন্দোলনে’ ছিলেন না, সে কারণেই পরবর্তীতে সুবিধাভোগী বৈষম্যবিরোধীরা বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েননি। তাছাড়া এই গ্রুপটি বর্তমানে বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে তাদের ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি’ও নাই। ফলে তারা বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে সরকার গঠনের প্রথমদিন থেকেই উৎখাতের হুমকি দেওয়া শুরু করলেও তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখে না। 

আরও পড়ুন

একথা বলাই বাহুল্য যে, গত সাড়ে পনেরো বছরের অপশাসন ও শোষণের কারণে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ; এবং সেই দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের আপামর জনগণ। ফলে তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। কিন্তু সদ্য দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে বিএনপি সমর্থকসহ দেশের জনগণের পাল্টা ক্ষোভ ঠেকানোর সামর্থ্যই তো এই নব্য আন্দোলনকারীদের নেই। ফলে জুলাই আন্দোলনের সময়কার মুখপাত্র এই রোমান্টিক আন্দোলনকারীদের বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ‍্যুত করার হুমকি এই মানুষগুলোর নির্বুদ্ধিতা ও অবিমৃষ্যকারিতা ছাড়া আর কিছু না।  

বর্তমানে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এ কারণে দেশের বঞ্চিত ও দরিদ্র জনগণের মধ্যে নতুন একটি আশার সঞ্চার হয়েছে। দেশের জনগণ এখন বিএনপির প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। গত দেড় বছরে বিএনপির ওপর চাঁদাবাজির যে তকমা পরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাও ব্যর্থ হয়েছে। সে পথে আর না আগানোই ভালো হবে। এ সময়ে সদ্য ক্ষমতা ও চাঁদাবাজির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ হারানো মানুষেরা যতই দুঃখিত ও হতাশ হোন না কেন, তাদের বিএনপি সরকারের ভুলের জন্য (যদি তারা আদৌ তা করেন!) অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। 

লেখক: নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission