ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন সরকার, নতুন বন্দোবস্ত!

জিয়া আহমদ

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
জিয়া আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। এই নির্বাচনটির তাৎপর্য অনেক গভীর। ২০০৬ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বানচাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে একটি নীলনকশার নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ডিপস্টেট ও অন্যান্য কুশীলবেরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেয় ২০০৯ সালে। তারপর পনেরো বছরের জন্য দেশের কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে এক ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা। অবশেষে ২০২৪ সালের এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন একটি নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হয়। কিন্তু সে পথও রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের একক কৃতিত্বের দাবিদার একটি পক্ষের নানান অন্যায় আবদারে। তারা নতুন বন্দোবস্তের নামে দেশে সবচেয়ে প্রাচীন শাসন বাবস্থা চাপিয়ে দিয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, পদ-ব্যবসা, চাঁদাবাজির এক মহোৎসবে মেতে উঠে। ফলে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়। সে প্রেক্ষাপটে বিএনপির নেতৃত্বে দেশের জনগণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে একাট্টা হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ঘোষণা করে। নির্বাচন বানচাল ও নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার নানা ষড়যন্ত্রকে অতিক্রম করে অবশেষে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

২০২৪-এ স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর যখন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশিত ছিলো, তখন দেশেরধর্মাশ্রয়ীই রাজনৈতিক দল ও গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্ররা ‘ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাব রোধের জন্য বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন’ শীর্ষক বয়ান নিয়ে মাঠে নামেন এবং নির্বাচনকে পিছিয়ে দেয়। তাদের যুক্তিটা ভালো হলেও তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে তাদের দাবি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সচিবালয়সহ দেশের সব কয়টি গুরুত্বপূর্ণ অফিসে তাদের কর্মী ও অনুসারীদের নিয়োগ ও বদলি করে আনা শুরু করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সদ্যপ্রাপ্ত ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী নাম নিয়ে কিছু তরুণ সচিবালয়সহ সারা দেশে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজি শুরু করেন। কোনকিছু তাদের মনমতো না হলেই তারা মবসৃষ্টিসহ নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নায্য-অনায্য দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে থাকেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশের সুবিধাবাদী নানা পেশাজীবীরাও তাদের অন্যায় দাবি আদায়ে একইপথ অবলম্বন করেন। দুর্বল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এদের এইসব অন্যায় দাবি মেনে পরবর্তী সরকারের ওপর আর্থিক দায় সৃষ্টি করতে বাধ্য হন।

নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর এই ধরনের মব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যারা এই মবকে ব্যবহার করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের জন্য এই বাস্তবতাটা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। তাদের চাঁদাবাজির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ এখন বাতিল হয়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে তাদের টাকা-পয়সা ও সদ্যলব্ধ আরাম-আয়েশের জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেবে। কেউ কেউ তো এখনই চাকরি খোঁজার নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করা শুরু করেছেন। তাছাড়া নানা উদ্ভট বক্তব্য দিয়ে যারা দেশের মিডিয়াতে সবসময় স্থান দখল করে থাকতেন, তাদের জন্য এখনকার নিস্তরঙ্গ সময়টাকে হজম করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে রাজত্ব করেছেন দীর্ঘদিন। তারা বুঝে-না-বুঝে সামাজিক মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এমন একটা বিভ্রমের সৃষ্টি করেছিলেন যে, তারা তো বটেই, সাধারণ মানুষেরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে ভবিষ্যৎ সরকার জামায়াতেরই হয় কিনা, এই ভেবে। তবে এনসিপি ও জামায়াতের ধূর্ত অংশটা, যারা বিএনপির জয়লাভের বিষয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. আলী রিয়াজের মাধ্যমে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসাবে একটা ঝামেলা পাকিয়ে রাখেন, যেটা হলো গণভোট।

519d7a05-bb98-4c51-b995-88b7943cceed

দীর্ঘ ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা প্রায় ৩০টি দলের সাথে আলোচনা করে, তাদের ‘নোট অফ ডিসেন্ট’গুলোকে সন্নিবেশিত করে যে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করেন, স্বাক্ষরের সময় প্রতারণার মাধ্যমে তাকে বদলে দিয়ে, ‘নোট অফ ডিসেন্ট’গুলোকে নিশ্চিহ্ন করে, ‘জুলাই সনদকে’ চূড়ান্ত করেন। বর্তমানে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এটা প্রত্যাশিত যে বিএনপি সরকার তার আপত্তির জায়গাগুলো বাদ দিয়েই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। জনগণের সরাসরি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এনসিপি ও জামায়াত এই বিষয়টিকে নিয়েই রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করবে। তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হোক বা না হোক, তারা রাজপথ্যকে গরম করার চেষ্টা যে করবে, তা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সামনে থাকা তরুণেরা, যারা আন্দোলনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ডিবি হারুনের কারাগারে আটক ছিলো, তারা এই গণ-অভ্যুত্থানের ভেতরের সংগঠন ও তার অন্তর্গত টেকনিক্যাল বিষয়গুলো সম্বন্ধে তেমন অবগত নয়। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম না করা এই ছেলেরা ‘ফোকটে’ নেতা বনে গিয়েছে। রাজপথে আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তার সময়ের প্রয়োজনেই নেতৃত্ব তাদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। যেহেতু তারা কোনও ‘স্ট্রাকচার্ড আন্দোলনে’ ছিলেন না, সে কারণেই পরবর্তীতে সুবিধাভোগী বৈষম্যবিরোধীরা বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েননি। তাছাড়া এই গ্রুপটি বর্তমানে বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে তাদের ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি’ও নাই। ফলে তারা বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে সরকার গঠনের প্রথমদিন থেকেই উৎখাতের হুমকি দেওয়া শুরু করলেও তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখে না।

আরও পড়ুন

একথা বলাই বাহুল্য যে, গত সাড়ে পনেরো বছরের অপশাসন ও শোষণের কারণে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ; এবং সেই দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের আপামর জনগণ। ফলে তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। কিন্তু সদ্য দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে বিএনপি সমর্থকসহ দেশের জনগণের পাল্টা ক্ষোভ ঠেকানোর সামর্থ্যই তো এই নব্য আন্দোলনকারীদের নেই। ফলে জুলাই আন্দোলনের সময়কার মুখপাত্র এই রোমান্টিক আন্দোলনকারীদের বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ‍্যুত করার হুমকি এই মানুষগুলোর নির্বুদ্ধিতা ও অবিমৃষ্যকারিতা ছাড়া আর কিছু না।

বর্তমানে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এ কারণে দেশের বঞ্চিত ও দরিদ্র জনগণের মধ্যে নতুন একটি আশার সঞ্চার হয়েছে। দেশের জনগণ এখন বিএনপির প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। গত দেড় বছরে বিএনপির ওপর চাঁদাবাজির যে তকমা পরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তাও ব্যর্থ হয়েছে। সে পথে আর না আগানোই ভালো হবে। এ সময়ে সদ্য ক্ষমতা ও চাঁদাবাজির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ হারানো মানুষেরা যতই দুঃখিত ও হতাশ হোন না কেন, তাদের বিএনপি সরকারের ভুলের জন্য (যদি তারা আদৌ তা করেন!) অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নাই।

লেখক: নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
নতুন সরকারের বাজেট উপস্থাপন ১১ জুন
‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নপূরণে কাজ করবে নতুন সরকার: অমিত শাহ
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে আনতে কী করবে নতুন সরকার, জানালেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেন ১৩ দেশের সরকারপ্রধান