images

আন্তর্জাতিক / মধ্যপ্রাচ্য

১৯৭৯ সাল থেকে যত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইরান

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ০৫:০৭ পিএম

ইরানে চলমান নজিরবিহীন বিক্ষোভের আবহে দেশটির গত পাঁচ দশকের এক দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে শাহ শাসনের পতনের পর থেকে আজ অবধি ইরানকে পাড়ি দিতে হয়েছে একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা। আল জাজিরার তথ্য অনুসারে গত ৫০ বছরে ইরানের শাসনব্যবস্থা শুধু বিক্ষোভই নয় বরং ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং সরাসরি সামরিক সংঘাতের মতো বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে ব্যর্থ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে তাকে ১৯৭৯ সালের পর দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানে গত পাঁচ দশকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি টাইমলাইন বা সময়রেখা তুলে ধরেছে আল জাজিরা। সেগুলো হলো:

আরও পড়ুন
10

ইরানে সামরিক হামলায় যেসব বিষয় বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয়াতুল্লাহ খোমেনির প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল। তবে এই শাসন ব্যবস্থার প্রথম বছরেই তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট তৈরি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটন প্রথমবার ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যা চিরস্থায়ী বৈরিতার জন্ম দেয়। উৎখাত হওয়া শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে সমর্থন করত যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সহায়তা করেছিল।

১৯৮০-এ ইরানে আক্রমণ চালায় ইরাক। অনুমান করা হয়, এই যুদ্ধে প্রায় ৫ লাখ মানুষ নিহত হন, যার বড় অংশই ইরানি। যুদ্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিখা, মেশিনগান ও বেয়নেট ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এছাড়া ইরাক ইরানি ও ইরাকি কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে। 

১৯৮১ সাল ছিল এক চরম অস্থিরতা ও রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বছর। ওই বছরের জানুয়ারিতে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে দীর্ঘ ৪৪৪ দিন ধরে আটকে থাকা সব মার্কিন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে ইরান জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় যা ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থার সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেয়। তবে জিম্মি সংকটের সমাধান হলেও দেশের ভেতরে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। 

জুন মাসে তেহরানে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির সদর দপ্তরে এক ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ইরানের তৎকালীন বিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ বেহেশতিসহ কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। আয়াতুল্লাহ খোমেনির পর বেহেশতিকে ইরানের দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তার এই মৃত্যু ইরানের শাসনব্যবস্থার জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি যা দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।

সহিংসতার এই ধারা সেখানেই থেমে থাকেনি বরং আগস্ট মাসে আরও এক শক্তিশালী বোমা হামলায় প্রাণ হারান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ বাহোনার। তেহরানের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলাকালীন এই হামলা চালানো হয় যা ইরান সরকারকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বামপন্থি বিপ্লবী বিরোধী সংগঠন মুজাহিদিন-ই খালক (এমইকে)-কে দায়ী করে। আগের বছর এই সংগঠনটিকে দমন করা হলেও তাদের এই প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড ইরানের শাসনব্যবস্থায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ১৯৮২ সাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ওই বছরের জুন মাসে ইসরাইল যখন লেবাননে বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালায়, তখন ইরান লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন ও অর্থায়ন শুরু করে। এই সহযোগিতার হাত ধরেই পরবর্তীতে লেবাননের প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ইসরাইলি আধিপত্য রুখতে তেহরানের এই কৌশলগত পদক্ষেপ ওই অঞ্চলে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে পারস্য উপসাগরে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয় বিশ্ব। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি বেসামরিক ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় বিমানের ২৯০ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারান। এই ঘটনাটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাকে এক চরম বিন্দুতে নিয়ে যায়। 

তবে একই বছরের আগস্ট মাসে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে একটি ইতিবাচক মোড় আসে। জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় ইরান ও ইরাকের মধ্যে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এই যুদ্ধবিরতি অঞ্চলটিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেও জুলাইয়ের সেই বিমান বিধ্বস্তের ক্ষত ইরানের ইতিহাসে আজও এক গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।

১৯৮৯ সালের ৩ জুন দীর্ঘ রোগভোগের পর ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মৃত্যুবরণ করেন। তার প্রয়াণে পুরো ইরানে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। খোমেনির মৃত্যু পরবর্তী শূন্যতা পূরণে দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

নেতা মারা যাওয়ার ঠিক পরদিন ৪ জুন ইরানের প্রভাবশালী ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়। এই পরিষদটিই দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা রাখে। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত করেন। আলী খামেনি এর আগে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার এই নির্বাচন দেশটির ক্ষমতা কাঠামোতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইরানের অর্থনীতির প্রধান উৎস জ্বালানি খাতের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসে ১৯৯৫ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির তেল ও বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মূলত মার্চ ও মে মাসে কয়েক দফায় এই বিধিনিষেধ ঘোষণা করে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন। ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ‘সন্ত্রাসবাদে’ পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা চালানোর গুরুতর অভিযোগ তুলে এই পদক্ষেপ নেয় ওয়াশিংটন। এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার প্রাথমিক চেষ্টা শুরু করে পশ্চিমা বিশ্ব।

১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর মাজার-ই-শরিফ দখলের সময় তালেবান বাহিনী আটজন ইরানি কূটনীতিক এবং একজন সাংবাদিককে হত্যার কথা স্বীকার করলে দুই দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় ইরান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। এর প্রতিবাদে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে আফগান সীমান্তে কয়েক হাজার সশস্ত্র সেনা ও ভারী সরঞ্জাম মোতায়েন করে যা ওই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।

এছাড়া পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে গত তিন দশকে ইরান অসংখ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের দেওয়া ‘অশুভ অক্ষ’ তকমা থেকে শুরু করে ট্রাম্পের আমলে পরমাণু চুক্তি বাতিল পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনাই দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটিতে আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি ঘটে যার প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আজও বিপন্ন। এছাড়া ১৯৯০ ও ২০০৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু দেশটিকে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতের মাত্রা আরও চরম রূপ নিয়েছে যেখানে ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় কাসেম সোলেইমানির মৃত্যু এবং ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় আইআরজিসি জেনারেলদের হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের সরাসরি যুদ্ধে কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে যা এই আঞ্চলিক উত্তেজনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার পরিক্রমায় বর্তমানের গণআন্দোলন ইরানের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে।

আরটিভি/এআর