মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ , ১১:২১ পিএম
তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে খ্যাতিমান অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা থালাপতি বিজয়ের অভিষেক সত্যিই অনেককে চমকে দিয়েছে। ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টি জিতে তার দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
‘থালাপাতি’ নামে পরিচিত এই তারকার এই সাফল্যকে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৫১ বছর বয়সি বিজয় তামিল সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ, আর তার এই জনপ্রিয়তাই রাজনৈতিক ময়দানে বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘২৩৪টি আসনেই বিজয়ই প্রার্থী’—যা তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের ওপর আস্থারই প্রতিফলন।
যদিও নির্বাচনী ফলাফল তার রাজনৈতিক যাত্রাকে সফল বলেই প্রমাণ করেছে, শুরুটা ছিল নাটকীয়। মাত্র ছয় বছর আগে তার বাবা-মা যখন তাকে রাজনীতিতে আনতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। পরে ২০২৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দল গঠন করেন।
বিজয়ের অভিনয়জীবনের শুরু ১৯৮৪ সালে, তার বাবা এস এ চন্দ্রশেখর-এর পরিচালনায় ‘ভেট্টি’ সিনেমার মাধ্যমে শিশু অভিনেতা হিসেবে। প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেতা হিসেবে শুরুতে খুব একটা সাফল্য পাননি। তবে ১৯৯৩ সালে ‘সেন্থুরপান্ডি’ মুক্তির পর তার ক্যারিয়ারে বড় মোড় আসে।
সেই ছবিতে বিজয়কান্ত-এর উপস্থিতিও তাকে জনপ্রিয়তা পেতে সাহায্য করে। এরপর ধীরে ধীরে রোমান্টিক ও পারিবারিক ঘরানার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান, আর পরে অ্যাকশন ছবির মাধ্যমে ‘থালাপাতি’ উপাধি অর্জন করেন।
তামিল ও তেলুগু সিনেমায় তারকাদের ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু বিজয়ের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। তার ফ্যান ক্লাবগুলো দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক কাজ—যেমন রক্তদান কর্মসূচি—চালিয়ে এসেছে অল ইন্ডিয়া থালাপতি বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম-এর ব্যানারে। ফলে রাজনৈতিক দল গঠনের আগেই তার হাতে একটি সুসংগঠিত, ক্যাডারভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে যায়।
ভক্তদের এই শক্তিকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা তার জন্য সহজ হলেও, শুরুতে তিনি কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকেই তার বাবা রাজনৈতিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন। তবে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিজয় নিজেই বলেছিলেন, বড় কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হলে তিনি রাজনীতিতে আসবেন না।
অবশেষে সেই সময় এসেছে বলে মনে করেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন। এম কে স্টালিন-এর নেতৃত্বে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) এবং এডাপাডি কে. পালানিস্বামী-এর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে)—এই দুই শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়ের মাঝেও তিনি মাঠে নামার সাহস দেখান।
ব্যক্তিগতভাবে বিজয় বেশ সংযত ও প্রচারবিমুখ। এই জায়গাটিই অনেকটা সামলে দিয়েছেন তার বাবা, যিনি শুরু থেকেই তার রাজনৈতিক অভিষেকের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে ২০২০ সালে তার অনুমতি ছাড়াই ‘বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম’কে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
পরে ২০২১ সালে বিজয় নিজেকে সেই সংগঠন থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং নিজের বাবা-মাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন। শেষ পর্যন্ত সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হয়। তবে রাজনীতিতে তার প্রভাব তখনই বোঝা যায়, যখন তার ফ্যান সংগঠনের সদস্যরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১৬৯টির মধ্যে ১১৫টি আসনে জয়ী হন। সেটাই ছিল তার রাজনৈতিক শক্তির প্রথম বড় ইঙ্গিত।
২০১৬ সালে জে জয়ললিতা-এর মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) দুর্বল হয়ে পড়ে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের ভাবমূর্তি। এই সুযোগে বিজয় কৌশলে দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম-ডিএমকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে আদর্শগত অবস্থান তুলে ধরেন। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা এই সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি বা আদর্শিক স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, নির্বাচনের ফলাফল বলছে—বিজয়ের সঠিক সময় নির্বাচন এবং সুপরিকল্পিত পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
আরটিভি/এসএস