বুধবার, ০৬ মে ২০২৬ , ০৯:১৩ এএম
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও উভয় পক্ষ একে অপরের জাহাজে হামলার অভিযোগ তুলেছে, যার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার(৫মে) বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে হরমুজ ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির নানা দিক উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে ১,৫৫০টিরও বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যেখানে অন্তত ২২,৫০০ নাবিক রয়েছেন। হরমুজ প্রণালির আকাশপথে ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রয়েছে শতাধিক মার্কিন সামরিক বিমান।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, উত্তেজনা বাড়লেও যুদ্ধবিরতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই নৌপথে নিরাপদ চলাচলের একটি করিডোর তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক অভিযান ঘোষণা করেছেন, যার লক্ষ্য হরমুজে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনা। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, এতে প্রায় ১৫ হাজার সেনা অংশ নিচ্ছে, পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে ডেস্ট্রয়ার ও আধুনিক যুদ্ধবিমান।
তবে এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালি ব্যবহারের চেষ্টা করলে গুলি চালানো হবে।
ইরানের শীর্ষ নেতা ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, “ইরান এখনও তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ শুরুই করেনি।”
ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি অস্বীকার করে উল্টো জানায়, তারা ইরানের ছয়টি নৌযান ধ্বংস করেছে। এসব ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে এবং বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী হরমুজ প্রণালির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও পূর্বদিকে সম্প্রসারিত দেখানো হয়েছে। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমার অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে তৈরি একটি খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইরান যদি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ না করে এবং মাইন বসানোর তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনও দেওয়া হতে পারে।
এর আগে একই ধরনের একটি প্রস্তাব রাশিয়া ও চীন ভেটো দেওয়ায় বাতিল হয়।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে গেছে। ফলে বৈশ্বিক মন্দা ও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালি এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর।
আরটিভি/এসকে