মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ০৬:১২ পিএম
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটছে একটি সমঝোতা চুক্তির মধ্য দিয়ে। তবে যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হলেও ইরান বরং আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে এনেছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই হঠকারী যুদ্ধ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিগত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ, এই যুদ্ধের ফলে শত্রুদের দমন করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে চিরাচরিত সক্ষমতা ও প্রভাব, তা চরমভাবে দুর্বল হয়েছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত রাজনীতির মধ্যেও এত দিন স্থিতিশীলতার দ্বীপ হিসেবে টিকে থাকা উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাটল ও বিশ্বাসহীনতা মেরামত করতে যুক্তরাষ্ট্রের এখন বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা জানান, পর্দার আড়ালে এখন আরব নীতিনির্ধারকেরা ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বৈদেশিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনার জোর আলোচনা শুরু করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ইরানের আঞ্চলিক শক্তির বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন কূটনৈতিক উপায় খুঁজছেন তারা। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এই যুদ্ধে তাদের অত্যন্ত মূল্যবান এবং সহজে প্রতিস্থাপন অযোগ্য বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্রের মজুত শেষ করছিল, তখন ওয়াশিংটনের চিরপ্রতিদ্বন্দী চীন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমেরিকার এই সামরিক ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা পর্যবেক্ষণ করেছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের কূটনীতিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে যে ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, তা কোনো স্থায়ী সমাধান না হলেও সাময়িক বড় স্বস্তি দিচ্ছে। এর ফলে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। বিশেষ করে, এই পথ বন্ধ থাকায় সারের বৈশ্বিক সরবরাহ যেভাবে ব্যাহত হয়েছিল, তাতে আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের দরিদ্র দেশগুলো যে চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছিল, তা থেকে আপাতত বিশ্ব রক্ষা পাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মূলত তেহরানের প্রকৃত শক্তি অনুধাবনে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ ভুল হিসেব-নিকেশেরই এক প্রকাশ্য উদাহরণ। যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকেই ইসরায়েলি নিখুঁত বিমান হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার শীর্ষ উপদেষ্টারা নিহত হন। একই সময়ে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে এক মার্কিন বিমান হামলায় একটি স্কুল ধ্বংস হয়ে ১২০ জনেরও বেশি কোমলমতি স্কুলছাত্রীসহ অন্তত ১৫০ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। এই আকস্মিক ও বিধ্বংসী ধাক্কার পর ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত এবং এর মাধ্যমে তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।
তবে বহিরাগত শক্তি দিয়ে রেজিম চেঞ্জের এই মার্কিন চক্রান্ত তেহরানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই চরম সংকট ও অস্তিত্বের লড়াইয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন তো ঘটেইনি, উল্টো তা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) এক অনমনীয় তরুণ প্রজন্ম দ্রুততার সঙ্গে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে এই নতুন ও সাহসী নেতৃত্ব অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও খোদ ইসরায়েলের ওপর পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এদিকে, যুদ্ধের পূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা ও চুক্তি প্রক্রিয়া থেকে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটা সময় যে ইরানকে ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই যুদ্ধ ব্যর্থ হওয়ায় এখন তিনি নিজের দেশের অভ্যন্তরেই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। আগামী অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার দায়ে নিজের দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে কাঠগড়ায় তিনি। এর মধ্যে বড় সংকট তৈরি করেছে লেবানন, সিরিয়া ও গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে রাখার ইসরায়েলি জেদ। ট্রাম্পের অসন্তোষ সত্ত্বেও লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নেতানিয়াহুর ওপর তার মন্ত্রিসভার উগ্রপন্থীরা চাপ দিচ্ছে।
আঞ্চলিকভাবে আপাতত একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলেও দুই দেশের মতাদর্শগত ফারাক এবং চরম পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই সমঝোতাকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তিতে রূপ দেওয়া এক দূরবর্তী কল্পনা। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। যে ইরানি জনগণকে ট্রাম্প স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারা এখনো সেই কঠোর শাসনের চাদরেই ঢাকা রুদ্ধশ্বাস জীবন কাটাচ্ছেন। দিনশেষে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আবেগতাড়িত ও একরোখা যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার অপচয় ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি, যা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার ক্ষয়িষ্ণু লড়াইকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
আরটিভি/এআর