বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬ , ১১:২০ পিএম
ভ্রমণে গিয়ে মাংস খাওয়া এড়াতে চেয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল সুস্থ থাকা। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে এক নিরামিষ খাবারই লোরি ডেনম্যান নামের এক ব্রিটিশ মিডিয়া কর্মীর জীবনকে নরক বানিয়ে ছেড়েছিল। অজান্তেই তার মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছিল ৩৮টি জীবন্ত পরজীবী। ৪২ বছর বয়সী এই নারী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই রোমহর্ষক ও অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্প সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে, যখন একটি রেস্তোরাঁর শৌচাগারে গিয়ে লোরি তার শরীর থেকে এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি বেরিয়ে আসতে দেখেন। লোরির ভাষায়, ‘এটি দেখতে ছিল অত্যন্ত বিরক্তিকর, ঠিক যেন একটি খাঁজকাটা সেলোটেপ।’ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এটি ছিল ‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’ নামের একটি ভয়ংকর ও বিরল রোগের প্রথম বাহ্যিক লক্ষণ।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. ব্র্যান্ডন হিলির মতে, ২০০৭ সালে তিন মাসের ভারত সফরের সময় লোরি এই পরজীবীর সংস্পর্শে আসেন। ফুড পয়জনিং এড়াতে লোরি পুরো সফরে মাংস খাওয়া বন্ধ রাখলেও, সম্ভবত ভালোভাবে না ধোয়া কোনো শাকসবজি বা কাঁচা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে শূকরের ফিতাকৃমির অত্যন্ত ক্ষুদ্র ডিম তার শরীরে প্রবেশ করে।
কৃমি দেখার এক বছরের মাথায় লোরির জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ২০১১ সালে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথার পর কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক খিঁচুনির শিকার হন তিনি। হাসপাতালে ক্যাট স্ক্যান এবং এমআরআই করার পর চিকিৎসকেরা লোরি ও তার মায়ের সামনে যে রিপোর্ট তুলে ধরেন, তা ছিল কল্পনাতীত। লোরির মস্তিষ্কের ভেতরে তখন ৩৮টি ফিতাকৃমির লার্ভা বা পরজীবী কিলবিল করছিল।
প্রাথমিক চিকিৎসায় পরজীবীনাশক ওষুধ ও স্টেরয়েড দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও কয়েক বছর পর রোগটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পরজীবীগুলোর চারপাশে লোরির মস্তিষ্কে বিশাল ফোলা অংশ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়। ফলে লোরির মধ্যে তীব্র মানসিক বিভ্রম বা সাইকোসিস এবং প্যারানয়া দেখা দেয়। তিনি নিজের কর্মক্ষমতা হারান এবং সম্পূর্ণ অবুঝ শিশুর মতো আচরণ শুরু করেন।
লোরির দীর্ঘদিনের বান্ধবী নিকোলা ব্রাউন সেই দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘আমি হাসপাতালে ওকে দেখতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ৪২ বছরের একটা মানুষ মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছিল, পর্দার আড়ালে লুকাচ্ছিল এবং বাবার কোলে পাঁচ বছরের শিশুর মতো বসে ছিল।’
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, লোরির মস্তিষ্কে থাকা পরজীবীগুলো এখন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় এবং শক্ত পাথরের মতো (ক্যালসিফাইড) হয়ে গেছে। এগুলোকে বের করার জন্য কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৭ সালের পর লোরির আর নতুন করে কোনো খিঁচুনি বা মানসিক বিভ্রম দেখা দেয়নি। তবে এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ক্ষত হিসেবে সারাজীবন তাঁকে মৃগীরোগের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।
আরটিভি/এআর