বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৪:৫৩ পিএম
রমজান এলেই শ্বাসকষ্টে ভোগা অনেক মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। প্রশ্নটা খুব পরিচিত- রোজা রেখে কি ইনহেলার নেওয়া যাবে? নিলে কি রোজা ভেঙে যাবে? ভয় আর দ্বিধার কারণে কেউ কেউ শ্বাসকষ্ট সহ্য করেই দিনের পর দিন কাটান। অথচ এই সিদ্ধান্ত কখনো কখনো জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রোজার সময় দিনের বেলায় ইনহেলার নেওয়ার প্রশ্নে ধর্মীয় সংশয় তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন, মুখ দিয়ে কিছু গ্রহণ করলেই রোজা ভেঙে যায়। এই ধারণা থেকেই মূলত বিভ্রান্তির শুরু।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী রোজা ভাঙে মূলত তিন কারণে- খাদ্য গ্রহণ, পানীয় গ্রহণ এবং শরীরের ভেতরে শক্তি জোগায় এমন কিছুর প্রবেশ। এর বাইরে ইচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্কও রোজা ভঙ্গের কারণ।
এখানে প্রশ্ন হলো, ইনহেলার কি খাবার বা পানীয়? কিংবা এটি কি শরীরে পুষ্টি বা শক্তি জোগায়?
সমসাময়িক অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনহেলার কোনো খাবার বা পানীয় নয়। এটি পাকস্থলীতে পৌঁছায় না, বরং সরাসরি ফুসফুসে গিয়ে কাজ করে। এতে ক্যালরি বা পুষ্টিগুণ নেই, যা শরীরকে শক্তি জোগায়।
এই যুক্তিতে বহু আলেমের অভিমত- ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভাঙে না। বিশেষ করে যাদের জন্য এটি জরুরি চিকিৎসা, তাদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়াই ইসলামের সহজ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে একটি সংখ্যালঘু মত রয়েছে, যেখানে বলা হয়- মুখ দিয়ে প্রবেশ করার কারণে ইনহেলার রোজা ভাঙতে পারে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিশ্লেষণ ও শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে এই মতটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অনেকেই মনে করেন।
কুরআন অসুস্থ মানুষের জন্য স্পষ্ট ছাড় দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন 'যে অসুস্থ, সে পরে রোজা পূরণ করতে পারবে। অর্থাৎ ইসলাম কখনোই রোগীকে কষ্টে ফেলে ইবাদত চাপিয়ে দেয় না।'
যদি ইনহেলার ছাড়া শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে সে অবস্থায় রোজা রাখা ফরজ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বরং জীবন রক্ষা করাই তখন অগ্রাধিকার।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ইনহেলার হলো ‘লোকাল মেডিসিন’। এটি শরীরের নির্দিষ্ট অংশে কাজ করে। খাবারের মতো এটি হজম হয় না, রক্তে গিয়ে শক্তি জোগায় না। ফলে একে পানাহারের সঙ্গে তুলনা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। বরং ইনহেলার বন্ধ রেখে রোজা রাখলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়ে রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারেন যা ইসলামের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
আমাদের সমাজে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে অনেক সময় অজ্ঞতাজনিত ভয় কাজ করে। রোজা ভেঙে যাবে এই আশঙ্কায় কেউ কেউ ইনহেলার না নিয়ে চরম ঝুঁকি নেন। অথচ ইসলাম এমন আত্মনাশের অনুমতি দেয় না।
ইমাম, আলেম ও চিকিৎসকদের সমন্বিত সচেতনতা এ ক্ষেত্রে জরুরি। মসজিদ, গণমাধ্যম ও পরিবার- সব জায়গায় স্পষ্ট করে বলা দরকার, চিকিৎসা নেওয়া গুনাহ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোজাদারদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নিজের রোগের মাত্রা বোঝা এবং প্রয়োজনে রোজা রেখে ইনহেলার ব্যবহার করা।
যদি কেউ মনে করেন, তার অসুস্থতা রোজা রাখার সামর্থ্য দেয় না, তাহলে পরে কাজা রোজা বা ফিদইয়ার বিধান রয়েছে- এটিও ইসলামেরই অংশ।
আরটিভি/এমএইচজে