ইফতারের পর ধূমপান: যা ঘটে শরীরে

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৮:৫৬ পিএম


ইফতারের পর ধূমপান: যা ঘটে শরীরে
প্রতীকী ছবি

রমজানের প্রতিদিনের ইফতার যেন শরীর–মনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার একটি বিরতি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর এই মুহূর্তে শরীর সবচেয়ে বেশি যত্ন চায়। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের হাত চলে যায় সিগারেটের দিকে। কারও কাছে এটি অভ্যাস, কারও কাছে আবার সারাদিনের ‘চাপ’ নামানোর সহজ উপায়। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ইফতারের পর ধূমপান শরীরের জন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর— এ যেন দুর্বল শরীরের ওপর একেবারে সরাসরি আঘাত।

বিজ্ঞাপন

খালি পেট, দ্রুত শোষণ

রোজার সময় দীর্ঘ ঘণ্টা খাবার না পাওয়ায় পাকস্থলী থাকে প্রায় খালি। ইফতারের পরপরই ধূমপান করলে সিগারেটের নিকোটিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায়। সাধারণ সময়ের তুলনায় তখন নিকোটিনের প্রভাব হয় তীব্র। মাথা ঘোরা, বমিভাব, বুক ধড়ফড়— এ ধরনের উপসর্গ অনেকেই তখন অনুভব করেন। কেউ কেউ একে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে এড়িয়ে যান, অথচ এটিই হতে পারে শরীরের প্রথম সতর্ক সংকেত।

বিজ্ঞাপন

হজমে বিঘ্ন, গ্যাস্ট্রিকের ঝুঁকি

ইফতারের খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পর হজমপ্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সময় ধূমপান পাকস্থলীর ভেতরের রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়ায়। ফলে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল, বুকজ্বালা কিংবা খাবার উল্টো উঠে আসার সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস থাকলে আলসারের ঝুঁকিও বাড়ে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক রোগীই রমজানে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ার পেছনে ইফতারের পর ধূমপানকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

হৃদযন্ত্রে হঠাৎ চাপ

ইফতারের পর শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে থাকে। ঠিক এই সময় ধূমপান করলে নিকোটিন স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। রক্তচাপও হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের পর ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে— যা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

বিজ্ঞাপন

ফুসফুসে তীব্র ধাক্কা

সারাদিন ধূমপান না করায় ফুসফুস কিছুটা বিশ্রাম পায়। কিন্তু ইফতারের পর একসঙ্গে ধোঁয়ার আঘাতে শ্বাসনালিতে জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি হয়। কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুক ভারী লাগা—এসব উপসর্গ তখনই দেখা দিতে পারে। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

অক্সিজেনের ঘাটতি

সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা কার্বন মনোক্সাইড রক্তে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ইফতারের পর যখন শরীর খাবার থেকে শক্তি নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। অনেকেই বলেন, ইফতারের পর সিগারেট খেলে ‘হালকা লাগে’, কিন্তু আসলে সেটি অক্সিজেন কমে যাওয়ার সাময়িক অনুভূতি।

পানিশূন্যতা বাড়ে

রোজার দিনে শরীর এমনিতেই পানিশূন্যতার দিকে থাকে। ধূমপান শরীর থেকে পানি বের করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ায়। ফলে ইফতারের পর ধূমপান করলে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা বাড়তে পারে। এতে পরের দিনের রোজাও হয়ে ওঠে আরও কষ্টকর।

রক্তে শর্করার ওঠানামা

ইফতারের খাবারের সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। নিকোটিন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় বলে এই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। চিকিৎসকেরা তাই রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের ইফতারের পর ধূমপান একেবারেই না করার পরামর্শ দেন।

লিভারের ওপর বাড়তি চাপ

লিভার শরীরের বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কারের কাজ করে। ইফতারের পর যখন লিভার খাবারের পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করছে, তখন ধূমপানের বিষাক্ত উপাদান একসঙ্গে ঢুকে পড়লে লিভারের ওপর চাপ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শরীরের সামগ্রিক বিপাকক্রিয়ায়।

দাঁত, মুখ ও গলার ক্ষতি

ইফতারের পর ধূমপান মুখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট করে। দাঁতে দাগ, মুখে দুর্গন্ধ, মাড়ির প্রদাহ—এসব সমস্যা তখন দ্রুত বাড়ে। দীর্ঘদিনে মুখ ও গলার ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হয়। রোজার পবিত্রতা ও শুচিতার ধারণার সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন অনেকেই।

আসক্তি আরও গভীর হয়

সারাদিন ধূমপান না করে ইফতারের পর প্রথম সিগারেট— এই অভ্যাসটি মস্তিষ্কে এক ধরনের পুরস্কার-সংকেত তৈরি করে। ফলে ধূমপানের প্রতি মানসিক নির্ভরতা আরও বাড়ে। অনেকে রমজানকে ধূমপান কমানোর সুযোগ হিসেবে নিতে চাইলেও এই ‘ইফতারের সিগারেট’ আসক্তিকে উল্টো শক্ত করে।

আরও পড়ুন

কেন এই সময় ঝুঁকি বেশি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের পর শরীর থাকে সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থায়। পাকস্থলী খালি, স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজনাপ্রবণ এবং হৃদযন্ত্র স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার পথে—এই তিনটি কারণ একসঙ্গে ধূমপানকে করে তোলে আরও বিপজ্জনক।

করণীয়

চিকিৎসকদের পরামর্শ— ইফতারের পর অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা ধূমপান এড়িয়ে চলা। পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা হাঁটা এবং ফলমূল খাওয়ার মাধ্যমে শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানো ভালো। অনেকের জন্য রমজান হতে পারে ধূমপান ছাড়ার সেরা সময়— কারণ দিনের বড় অংশে শরীর ইতিমধ্যেই অভ্যাস থেকে দূরে থাকে।


>>> ইফতারের পর ধূমপান একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস হলেও এর প্রভাব পড়ে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ–প্রত্যঙ্গে। যে সময়টি পুনরুদ্ধার ও সুস্থতার, সেই সময়েই যদি আমরা শরীরকে ক্ষতির দিকে ঠেলে দিই, তবে তা নীরব বিপদেরই নামান্তর। রমজান সংযমের মাস—এই সংযম যদি ধূমপানেও আনা যায়, তবে তা শুধু আধ্যাত্মিক নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও বড় লাভ।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission