বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ , ০৩:৩০ পিএম
দেশের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেলে ‘ডোরি ফিশ’ নামে যে মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বিদেশি সামুদ্রিক মাছের নামে আসলে কি ভোক্তাদের পাঙাশ মাছ খাওয়ানো হচ্ছে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশে ডোরি মাছ আমদানির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর এ তথ্য সামনে আসার পরই ভোক্তাদের মধ্যে বেড়েছে কৌতূহল ও বিভ্রান্তি।
দেশে কি সত্যিই ডোরি মাছ আসে?
ঢাকায় অবস্থিত সার্ক কৃষি কেন্দ্রের মৎস্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ মো. শরীফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী গত দুই বছরে বাংলাদেশে ডোরি নামে কোনো মাছ আমদানি হয়নি।
তিনি বলেন, এর আগে সীমিত পরিমাণে একটি অভিজাত হোটেল বিদেশ থেকে ডোরি মাছ এনেছিল। তবে বর্তমানে রেস্তোরাঁগুলোতে ডোরি নামে যে মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে, তা আসল ডোরি কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাহলে কী খাচ্ছেন ভোক্তারা?
মো. শরীফুল ইসলামের মতে, রেস্তোরাঁয় ডোরি মাছের নামে মূলত ভিয়েতনামে উৎপাদিত এক ধরনের পাঙাশ মাছ পরিবেশন করা হতে পারে।
এই মাছটি ‘বাসা’ নামে পরিচিত। নদীতে চাষ করা এ মাছের গন্ধ দেশি পাঙাশের মতো নয়। এর মাংস বেশি সাদা এবং স্বাদও কিছুটা ভিন্ন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এটি ডোরি মাছ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাছটি শনাক্ত করা এত কঠিন কেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ ভোক্তার পক্ষে মাছটি দেখে আসল পরিচয় জানা প্রায় অসম্ভব।
কারণ রেস্তোরাঁয় পরিবেশনের সময় মাছের মাথা, চামড়া, কাঁটা কিংবা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য থাকে না। শুধু মাংসের অংশ পরিবেশন করা হয়। ফলে বাহ্যিকভাবে এটি ডোরি নাকি অন্য কোনো মাছ, তা বোঝা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিশ্চিতভাবে পরিচয় জানতে হলে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
আসল ডোরি মাছ কেমন?
ডোরি বা জন ডোরি একটি সামুদ্রিক মাছ। এর শরীর চ্যাপ্টা, মাথা বড় এবং শরীরের দুই পাশে গোল কালো দাগ থাকে। এই বিশেষ দাগের কারণেই মাছটি সহজে চেনা যায়।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর এবং আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে এ মাছ পাওয়া যায়। এটি অন্য মাছ, চিংড়ি ও সামুদ্রিক প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে।
বিশ্বজুড়ে ডোরি মাছের সবচেয়ে বড় পরিচিতি এর স্বাদের জন্য। এর সাদা মাংস নরম হলেও সহজে ভেঙে যায় না। স্বাদ মৃদু ও হালকা মিষ্টি হওয়ায় নানা ধরনের রান্নায় এটি জনপ্রিয়।
কেন এত দামি ডোরি মাছ?
বিশ্বের অনেক দেশে ডোরি মাছকে অভিজাত রেস্তোরাঁর খাবার হিসেবে ধরা হয়।
বিদেশের বাজারে এক কেজি ডোরি মাছের মাংসের দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর দাম আরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায় এবং পুরো মাছের তুলনায় খাওয়ার উপযোগী অংশ কম হওয়ায় এর দাম বেশি।
দেশে ডোরি নামে বিক্রি হওয়া মাছের দাম কত?
দেশের বিভিন্ন অনলাইন মাছ বিক্রেতার তালিকা অনুযায়ী, ডোরি নামে বিক্রি হওয়া মাছের মাংসের দাম সাধারণত প্রতি কেজি ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।
এই বিশাল মূল্য পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেক ভোক্তা।
রাসায়নিকের অভিযোগে নতুন শঙ্কা
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ডোরি নামে বিক্রি হওয়া কিছু মাছে স্বাদ পরিবর্তনের জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হতে পারে।
এ বিষয়ে চিকিৎসক ডা. সাইফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, যদি সত্যিই ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তিনি জানান, কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তা না জেনে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা কঠিন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ডোরি মাছ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—রেস্তোরাঁয় ডোরি নামে যে মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে, তা আসলে ডোরি, নাকি অন্য কোনো মাছ? উত্তর জানতে প্রয়োজন আরও গবেষণা ও পরীক্ষার।
আরটিভি/জেএমএ