বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ , ০১:৪৬ পিএম
লোহা দীর্ঘদিন বাইরে থাকলে মরিচা ধরে, তামার গায়ে সবুজ আস্তরণ পড়ে, রুপার রংও কালচে হয়ে যায়। কিন্তু বহু বছর, এমনকি হাজার বছর পার হলেও স্বর্ণের গয়না বা সোনার তৈরি পুরোনো নিদর্শনে মরিচা পড়ে না। কেন এমন হয়? সম্প্রতি এ রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা।
বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই জানতেন, সোনা অন্য ধাতুর তুলনায় অক্সিজেনের সঙ্গে খুব কম বিক্রিয়া করে। তবে কেন এমন হয়, তার বিস্তারিত কারণ এতদিন পুরোপুরি জানা ছিল না। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সোনার গায়ে থাকা ক্ষুদ্র পরমাণুগুলো নিজেরাই এমনভাবে অবস্থান বদলে নেয়, যাতে অক্সিজেন সহজে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে না পারে। সহজ ভাষায়, সোনা নিজেই নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা তৈরি করে।
মরিচা আসলে কী?
লোহার গায়ে যে লালচে স্তর দেখা যায়, সেটিই মরিচা। বিজ্ঞানীরা একে বলেন জারণ। বাতাসের অক্সিজেন ধাতুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে নতুন যৌগ তৈরি করলে এই প্রক্রিয়া ঘটে।
সব ধাতুর ক্ষেত্রে এর ফল এক রকম নয়। লোহায় মরিচা পড়ে, তামায় সবুজ আস্তরণ তৈরি হয়, রুপা কালচে হয়ে যায়। কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন প্রায় দেখা যায় না। এ কারণেই স্বর্ণকে অত্যন্ত কম বিক্রিয়াশীল ধাতু হিসেবে ধরা হয়।
সোনা কীভাবে নিজেকে রক্ষা করে?
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুনভাবে কাটা স্বর্ণের পৃষ্ঠে থাকা পরমাণুগুলো স্থির থাকে না। তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থান বদলে নতুন একটি বিন্যাস তৈরি করে।
প্রথমে পরমাণুগুলো অনেকটা চারকোনা বিন্যাসে থাকলেও পরে তারা ষড়ভুজ আকৃতির মতো একটি নতুন বিন্যাসে চলে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে অক্সিজেনের পক্ষে সোনার সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, যদি এই অবস্থান পরিবর্তন না হতো, তাহলে নতুন কাটা সোনা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করতে পারত। কিন্তু পরমাণুর এই নতুন বিন্যাসের কারণে জারণের গতি প্রায় ১০০ কোটি থেকে ১০ লাখ কোটি গুণ পর্যন্ত ধীর হয়ে যায়।
তাহলে কি স্বর্ণে কখনোই বিক্রিয়া হয় না?
অনেকের ধারণা, সোনা কখনোই অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। তবে এটি পুরোপুরি সত্য নয়।
বিশেষ পরীক্ষাগারের নির্দিষ্ট পরিবেশে সোনা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে একটি নতুন পদার্থ তৈরি করতে পারে। তবে সেটি খুবই অস্থায়ী। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভেঙে যায়। ফলে সোনার রং ও উজ্জ্বলতায় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায় না।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?
গবেষকদের মতে, এই গবেষণা শুধু সোনার রহস্য জানার জন্য নয়। এর মাধ্যমে এমন নতুন উপাদান তৈরির পথও খুলতে পারে, যা বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করবে।
এসব উপাদান নতুন ওষুধ তৈরি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন, শিল্পকারখানার বিভিন্ন কাজে এবং যানবাহনের ক্ষতিকর ধোঁয়া কমাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
শুধু গয়না নয়, প্রযুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ
সোনা শুধু সৌন্দর্যের জন্য মূল্যবান নয়। এটি সহজে মরিচা ধরে না, রং বদলায় না, বিদ্যুৎ ভালো পরিবহন করে এবং সহজে আকার দেওয়া যায়। তাই গয়নার পাশাপাশি মহাকাশ প্রযুক্তি, কম্পিউটারের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন এবং চিকিৎসা যন্ত্রেও স্বর্ণের ব্যবহার রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার ঝকঝকে উজ্জ্বলতার পেছনে রয়েছে কোটি কোটি ক্ষুদ্র পরমাণুর নিখুঁত বিন্যাস। তাদের এই স্বাভাবিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণেই সোনা দীর্ঘদিন উজ্জ্বল থাকে এবং সহজে মরিচা ধরে না।
আরটিভি/জেএমএ