বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ , ১০:২৯ এএম
কিডনি আমাদের শরীরের রক্ত থেকে বর্জ্য, অতিরিক্ত পানি ও ক্ষতিকর পদার্থ ছেঁকে বের করে দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে কিডনি যখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন তাকে কিডনি বিকল বলা হয়। এ অবস্থায় শরীর সুস্থ রাখতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি বিকলের প্রধান তিনটি চিকিৎসা হলো রক্ত পরিশোধনের চিকিৎসা, পেটের ভেতর বিশেষ তরলের মাধ্যমে রক্ত পরিষ্কার করার চিকিৎসা এবং কিডনি প্রতিস্থাপন। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ওষুধ ও খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হয়।
রক্ত পরিশোধনের চিকিৎসা
এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করা হয়। প্রথমে হাতে একটি রক্তনালিতে ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংযোগ তৈরি করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ত যন্ত্রে নিয়ে ছেঁকে আবার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সাধারণত সপ্তাহে তিন দিন এই চিকিৎসা নিতে হয় এবং প্রতিবার প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। এটি হাসপাতাল বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলে বাসাতেও করা সম্ভব।
তবে এ চিকিৎসায় ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, পেশিতে টান, ত্বকে চুলকানি, রক্তচাপ কমে যাওয়া কিংবা সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পেটের ভেতর বিশেষ তরলের মাধ্যমে চিকিৎসা
এই পদ্ধতিতে যন্ত্রের বদলে পেটের ভেতরের আবরণকে প্রাকৃতিক ছাঁকনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ছোট একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পেটে একটি নরম নল বসানো হয়। এরপর বিশেষ তরল পেটের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে কয়েক ঘণ্টা রাখা হয়। এই তরল রক্তের বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি টেনে নেয়। পরে সেই তরল শরীর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ চিকিৎসা সাধারণত বাসায় করা যায়। তবে যাদের পেটের গঠনে জটিলতা, অতিরিক্ত স্থূলতা বা অন্ত্রের কিছু রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপযুক্ত নাও হতে পারে।
এতে ক্লান্তি, সংক্রমণ, ওজন বৃদ্ধি, চুলকানি বা হার্নিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
কিডনি প্রতিস্থাপন
কিডনি বিকলের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো সুস্থ একজন দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন কিডনি শরীরে বসানো হয় এবং সেটিই পরে রক্ত ছেঁকে শরীরকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
তবে এটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। প্রতিস্থাপনের পর সারাজীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখার ওষুধ খেতে হয়, যাতে শরীর নতুন কিডনিকে প্রত্যাখ্যান না করে।
সব রোগী কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য উপযুক্ত হন না। গুরুতর সংক্রমণ, কিছু ধরনের ক্যানসার, হৃদ্রোগ, ফুসফুসের জটিলতা বা অতিরিক্ত স্থূলতা থাকলে চিকিৎসকেরা অনেক সময় এই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন না।
অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত কিডনির জন্য কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এ সময় নিয়মিত রক্ত পরিশোধনের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।
ওষুধেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কিছু সমস্যা
কিডনি বিকল পুরোপুরি ভালো করার ওষুধ না থাকলেও বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, রক্তস্বল্পতা, শরীরে পানি জমা, হাড়ের সমস্যা ও খনিজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
কিছু রোগী চিকিৎসকের পরামর্শে শুধু ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস ও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও জীবনযাপন করেন। তবে এতে কিডনি বিকল সারে না, বরং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কিডনি বিকল ঠেকাতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের কিডনি রোগ থাকলে কিছু নিয়ম মেনে চললে কিডনি বিকলের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
১. কিডনির জন্য উপযোগী সুষম খাদ্য গ্রহণ
২. লবণ, প্রোটিন, পটাশিয়াম ও ফসফরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা
৩. নিয়মিত শরীরচর্চা করা
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
৫. ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকা
৬. ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
৭. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর ওষুধ না খাওয়া
৮. নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি বিকল একটি গুরুতর অবস্থা হলেও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রোগীর জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: হেলথ লাইন
আরটিভি/জেএমএ