রোববার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ০৫:১৬ পিএম
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় সিসার উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রোটিন পাউডার, দারুচিনি, আপেল এমনকি ডার্ক চকলেটের মতো নিয়মিত ব্যবহৃত পণ্যগুলোতেও ক্ষতিকর এই উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। সিসা মূলত মাটি ও পরিবেশে বিদ্যমান একটি মৌলিক উপাদান হওয়ায় গাছপালা ও প্রাণিজ খাদ্যে এর সামান্য উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। তবে এই সামান্য মাত্রার ঝুঁকি এবং জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা মোকাবিলায় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সিসার সংস্পর্শে আসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। সামান্য পরিমাণ সিসাও শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে সিসা দূষণের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুদের রক্তে সিসার গড় ঘনত্ব প্রতি লিটারে ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ৩৫ মাইক্রোগ্রামের প্রায় দ্বিগুণ।
এই নীরব বিষ শিশুদের আইকিউ কমিয়ে দিচ্ছে এবং নানা ধরনের আচরণগত সমস্যা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপের ক্ষেত্রে ‘ডোজ’ বা পরিমাণের গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) সিসা গ্রহণের যে সর্বোচ্চ দৈনিক সীমা নির্ধারণ করেছে, তা যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই করা হয়েছে। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সিসা দূষণ এড়ানোর অন্যতম প্রধান উপায় হলো খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা। কোনো নির্দিষ্ট খাবার নিয়মিত বা অতিরিক্ত পরিমাণে না খেয়ে সব ধরনের খাবার পরিমিতভাবে গ্রহণ করলে সিসাসহ অন্যান্য পরিবেশগত দূষণকারীর সংস্পর্শ কমে যায়।
পাশাপাশি সিসাযুক্ত মসলা, খেলনা বা প্রসাধনী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের মাটি বা পুরোনো রং করা দেয়ালের কাছে খেলতে না দেওয়া এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, সিসার প্রধান উৎসগুলো যেমন—পুরোনো রং, দূষিত পানি এবং ব্যাটারি কারখানার বর্জ্যের ওপর কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে দূষণের হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত মাটি পরিষ্কার করা, সিসাযুক্ত পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রির ওপর কঠোর নজরদারি এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সিসা নিয়ে অহেতুক ভয় না পেয়ে বৈচিত্র্যময় ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও সিসামুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
সূত্র: ওয়েব এমডি, জার্নাল অব হেলথ অ্যান্ড পলিউশন
আরটিভি/এএইচ