শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৯:৪৪ পিএম
কারা হেফাজতে মারা যাওয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিগত এক বছরে কারাবন্দী অবস্থায় বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিদের পরিবার ও সহকর্মীদের পক্ষ থেকে চিকিৎসা প্রদানে দেরি বা অবহেলার অভিযোগও উঠেছে। তবে এই মৃত্যুগুলোর পেছনে অসুস্থতা, বার্ধক্যসহ জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকার দাবি করছে কর্তৃপক্ষ। তবুও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি মানবিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এভাবে হেফাজতে মৃত্যুকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১৫ মাসে ১১২ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। সংস্থাটির হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মারা গেছেন ৯৫ জন। আর ২০২৪ সালে ১২ মাসে মারা গেছেন ৬৫ জন। মৃতদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী রয়েছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১২ মাসে কারাগারে ১৮ জন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৮ দিনে কারা হেফাজতে মোট ৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন।
সর্বশেষ রমেশ চন্দ্র এবং আরও পাঁচটি মৃত্যু
সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ (সদর উপজেলা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) রমেশ চন্দ্র সেন শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টায় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কারা হেফাজতে মারা যান। রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করে কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, তিনি দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি নওগাঁ জেলা কারাগারে মৃত্যু হয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশিদের। রশিদ রানীনগর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
জানুয়ারির ১১ তারিখ মারা যান পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক প্রলয় চাকী। ঠিক দুই দিন পর ১৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে মৃত্যু হয় আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবিরের। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সহ-সভাপতি ছিলেন।
অন্যদিকে ২৫ জানুয়ারি মেহেরপুর জেলা কারাগারে বন্দী গোলাম মোস্তফা (৫৫) নামের এক আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়। গোলাম মোস্তফা মহাজনপুর ইউনিয়ন শাখার সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন।
এছাড়া ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে মারা যান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রহমান মিয়া। চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদের বাসিন্দা এই আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের সহসভাপতি ছিলেন।
‘সবাই অসুস্থ ছিলেন’
কারা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে মারা যাওয়া এসব আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যেকেই হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। এরা প্রত্যেকেই কারাগারে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।
আবার ২০২৪ সালের শুধু নভেম্বর মাসেই বগুড়া জেলা কারাগারে চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ তখন জানায়, এসব নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে ‘হার্ট অ্যাটাক’ কিংবা অন্যান্য ‘অসুস্থতায়’ এদের মৃত্যু হয়েছে, কারা কর্তৃপক্ষের এমন দাবি তাদের পরিবারগুলো গ্রহণযোগ্য মনে করেনি। এক মাসে চারজন মারা যাওয়ার ঘটনায় একজনের সন্তান গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তার বাবা ‘কখনোই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন না’ এবং কারাগারে যখন তারা সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন তখনও কোনো অসুস্থতার কথা তার বাবা তাদের জানাননি।
এভাবে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের মৃত্যু হয়। কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান তিনি। কর্তৃপক্ষ জানায়, আগে থেকেই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।
দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায়, মেলেনি জামিন
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কারাবন্দি এসব আওয়ামী লীগ নেতাদের আইনগত প্রক্রিয়ায় জামিনের জন্য বহুবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তারা জামিন পাননি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার অভিযোগে করা একটি মামলায় ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর সহকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাকিবুল ইসলামের আদালতে তাকে হাজির করে রিমান্ড দাবি করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, আদালত তার রিমান্ড মঞ্জুর করেননি এবং তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কিন্তু তারপর ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়ার আগপর্যন্ত নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের আইনজীবীরা আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তবুও জামিন পাননি গুরুতর অসুস্থ সাবেক এই মন্ত্রী।
একইভাবে ভীষণ অমানবিক ঘটনা চট্টগ্রামের আবদুর রহমান মিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। ৭০ বছর বয়সী এই আওয়ামী লীগ নেতা দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসা আর শেষ সময়ে তিনি যেন একটু ভালো থাকতে পারেন সেই চেষ্টায় আব্দুর রহমান মিয়ার পরিবার বহুবার ছুটে গেছেন আদালতে। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতে জামিন হয়নি তার, কারাগার থেকে জামিন পেয়েছেন সৃষ্টিকর্তার আদালতের মাধ্যমে!
মানবাধিকার নিয়েই প্রশ্ন
কারা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, দেশের ৭২টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৮৭ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে বেশ বড় অংশই রাজনৈতিক বন্দি। শেখ হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন মামলায় এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ১৩১ জন ভিআইপিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, এমপি, সচিব, বিচারপতি ইত্যাদি রয়েছেন।
কারাবন্দি এসব ব্যক্তিদের অনেকেই বয়স্ক এবং গুরুতর অসুস্থ। বন্দি ব্যক্তিদের অনেকের পরিবার ও আইনজীবীদের দাবি, এসব রাজনৈতিক বন্দিদের সঠিক চিকিৎসাও জুটছে না। অসুস্থ অবস্থায়ও রাজনৈতিক বিবেচনায় আটকে রাখা হচ্ছে কারাগারে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নানারকম নির্যাতন। এমনকি খাবার এবং ওষুধ পর্যন্ত ঠিকমতো জুটছে না। পাশাপাশি আদালতে বার বার আবেদন করা হলেও জামিন মিলছে না কারও।
মানবাধিকার সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ বলছে, ‘২৪ সালের অভ্যুত্থানের আগেও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক ছিল এবং অভ্যুত্থানের পরও পরিস্থিতি বদলায়নি।’ সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট পুরোপুরি ভায়োলেট করা হচ্ছে। গত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির কারণে আমরা রাস্তায় নেমেছিলাম, কিন্তু নতুন সরকার আসার পরও পরিবর্তনের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে না।’
এদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রচলিত গুম, ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি অনেকাংশে কমেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে আটক করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী হত্যা মামলায় কারাবন্দি। বিচারহীন অবস্থায় আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিত নাকচ করা হচ্ছে। এ তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন।
আরটিভি/এআর