রোববার, ০৭ জুন ২০২৬ , ০১:৩৮ পিএম
আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দেশব্যাপী প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে সারাদেশে সচেতনতামূলক র্যালি, বাউল গানের মাধ্যমে প্রচারণা, সপ্তাহে একদিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কমিউনিটি মিটিং, উঠান বৈঠক এবং জনসচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ‘ডেঙ্গু কর্নার’ চালু, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ, ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত, রিএজেন্ট ও টেস্টিং কিট সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার স্যালাইনের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে।
মশাবাহিত এই রোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের সাতটি সিটি করপোরেশন। নিজ নিজ এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় পৃথক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে তারা।
এবার প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ‘প্রাক-বর্ষা এডিস মশার লার্ভা জরিপ’ পরিচালনা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অন্যদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুর ও সংগীতভিত্তিক ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ‘ডেঙ্গু কর্নার’ স্থাপন করা হচ্ছে এবং চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে একটি ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে আরও ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অন্তত ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে চিকিৎসকদের ডেঙ্গু রোগীদের কাছ থেকে ভিজিট ফি না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার খরচে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সরকারের কাছে প্রায় ২ লাখ ব্যাগ খাবার স্যালাইন মজুত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় মজুত আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শনিবার (৬ জুন) দেশব্যাপী সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই দিনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক অভিযানের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। কোনো বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুই থেকে তিন দিন পরপর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। করোনাকালে যেমন সবাই একযোগে কাজ করেছে, তেমনি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, জনগণের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ। উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে পাঁচদিনব্যাপী বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ যৌথভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য অপসারণ, জনসচেতনতা মূলক প্রচারণা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিবিড় নজরদারি চালানো হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত বলেন, প্রতিটি নাগরিক যদি ডেঙ্গু প্রতিরোধকে ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, জনগণকে সচেতন করতে আগামী তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে ইমামদের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের আগাম প্রস্তুতি, সিটি করপোরেশনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
আরটিভি/এমএইচজে