শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ০৮:১৩ পিএম
পরিবার ও স্বজনদের কাছে দোয়া চেয়ে পাঠানো অডিও বার্তায় তার কণ্ঠস্বরে ভয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। বার্তাটি পাঠানোর পর ২৪ বছর বয়সী সিরাজ উল্লাহ একটি নৌকায় ওঠেন। তিনি আশা করেছিলেন, এ নৌকাটি তাকে মিয়ানমারে নিজের বসতভিটায় চলমান সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি দেবে।
কিন্তু এর পরিবর্তে, জুনের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্রযাত্রা করে নিখোঁজ হওয়া ৫০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর একজন হয়ে গেছেন সিরাজ।
ভয়েস মেসেজে তিনি বলেন, দয়া করে আমার এবং সব যাত্রীর জন্য দোয়া করবেন। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছি, কিন্তু আমাদের আর কিছুই করার নেই। আমি এই জীবন আর সহ্য করতে পারছি না।
সিরাজ আশা করেছিলেন, মালয়েশিয়ায় গিয়ে তিনি পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু এক মাস পার হওয়ার পর এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের বহনকারী নৌকাটি ডুবে গেছে।
সিরাজের শেষ বার্তাটি থেকে বোঝা যায় যে, চলতি বছর হাজার হাজার রোহিঙ্গা যে বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি অবগত ছিলেন। গত এপ্রিলেই আন্দামান সাগরে নৌকাডুবিতে ২৫০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।
কয়েক দশকের নিপীড়ন ও সামরিক সহিংসতার পর মিয়ানমারে এখন আনুমানিক ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অবশিষ্ট আছে বলে ধারণা করা হয়। অথচ এক দশক আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ক্যাম্পগুলোতে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছে।
দালাল ও মানবপাচারকারী চক্র মালয়েশিয়ায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ—উভয় স্থান থেকেই রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করে আসছে। প্রায়ই এসব মানুষকে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য অনুপযোগী নৌকায় গাদাগাদি করে তোলার আগে ব্যাপক নির্যাতন ও চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়।
সিরাজের ভাতিজা মমতাজ উল্লাহর মতে, গত ২২ জুন পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। ওই সময় একটি নৌকা প্রথমবার রওনা হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে এবং কয়েক দিন পর আবার যাত্রা শুরু করে।
মমতাজ বলেন, আমরা জানি না সে বেঁচে আছে কিনা। আর দশজনের মতো আমরাও ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। মনে হচ্ছে যেন আমাদের টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন গুজব ছড়িয়েছে যে, প্রতিপক্ষ পাচারকারীরা নৌকাটি ছিনতাই করে থাকতে পারে, তবে এ বিষয়ে অন্য কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, মিয়ানমার উপকূলে সম্প্রতি দুটি নৌকা ডুবে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর একটিতে ২৫০ এবং অপরটিতে ২৮০ জন যাত্রী ছিল। অনেকটাই নিশ্চিত যে, সিরাজ এই দুটি নৌকার কোনো একটিতে ছিলেন।
তিনি স্বেচ্ছায় যাত্রা করেছিলেন। তবে এক মানবাধিকার গবেষক (যিনি তার সংস্থার পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি পাননি) দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, অন্যান্য পরিবারগুলোর দাবি—তাদের স্বজনদের মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশ থেকে অপহরণ করে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা পাচারকারীদের মুক্তিপণ দিতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত তাদের সেখানে জিম্মি করে রাখা হয়।
২০০০-এর দশকের শুরু থেকে বঙ্গোপসাগর ও মালয়েশিয়ার মধ্যে একটি বিশাল অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের মরিয়া আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে তারা লাভবান হচ্ছে।
১৯৮২ সালে মিয়ানমারে এ মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। এরপর থেকে তারা কয়েক দফায় বহিষ্কার ও নিধনের শিকার হয়ে মূলত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশে আসার পর রোহিঙ্গাদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধের পাশাপাশি কাজ বা শিক্ষার সুযোগও সীমিত।
সিরাজ উল্লাহ ২০১৭ সালে প্রথমবার মিয়ানমার ছাড়েন, যখন সামরিক বাহিনীর চরম সহিংস অভিযানের মুখে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে তিনি তার ভাতিজা মমতাজের সঙ্গে থাকতেন।
মমতাজ বলেন, আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি, খেলাধুলা করেছি। আমরা চাচা-ভাতিজার চেয়ে বন্ধু বা ভাইয়ের মতোই বেশি ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় হওয়া। এতসব প্রতিকূলতার পরও সে তার এই স্বপ্নটি আঁকড়ে ধরেছিল।
রোহিঙ্গা দলগুলোর হয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে ফুটবলার হিসেবে পুরস্কারও জিতেছিলেন সিরাজ। কিন্তু বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে খেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তার পক্ষে এ আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। সেবার তাদের নৌকা ঝড়ের কবলে পড়ে এবং যাত্রীরা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ে। অনুমতি ছাড়া গ্রাম ছাড়ার কারণে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবেই রোহিঙ্গাদের কারাদণ্ড দিয়ে থাকে।
তাকে মুক্ত করতে তার পরিবারকে ২৯ লাখ মিয়ানমার কিয়াট (প্রায় ১ হাজার পাউন্ড বা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা) ঘুস দিতে হয়েছিল।
গত ২৪ মাসে মিয়ানমারের পরিস্থিতির আবারও মারাত্মক অবনতি হয়েছে। রাখাইন নৃগোষ্ঠীর বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে দেড় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের হত্যা, জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা এবং মানবঢাল হিসেবে যুদ্ধে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
সিরাজের মতো তরুণদের কাছে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার এ চরম ঝুঁকি নেওয়াটাই হয়তো বাঁচার একমাত্র উপায় বলে মনে হতে পারে।
মমতাজ বলেন, আমরা তাকে না যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলাম। কারণ আমরা জানতাম এ পথ কতটা বিপজ্জনক। কিন্তু সে মনে করত তার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই... এটি কেবল সিরাজের গল্প নয়, এটি আরও হাজারো রোহিঙ্গা পরিবারের গল্প। আমরা এখনও আশা করি, সিরাজ বেঁচে আছে, আমরা দোয়া করি একদিন সে বাড়িতে ফিরে আসবে।
আরটিভি/ এসকেডি