বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬ , ০১:২৬ পিএম
মানুষের মতো তিমিরও কি আলাদা আলাদা আঞ্চলিক ভাষা থাকতে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে ঠিক এমনই বিস্ময়কর তথ্য। এমনটাই জানা যায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদলু এজেন্সির এক প্রতিবেদন থেকে।
গবেষকদের দাবি, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে বসবাসকারী স্পার্ম তিমি একে ওপরের সঙ্গে ভিন্ন ধরনের শব্দের ছন্দে যোগাযোগ করে। অর্থাৎ, তাদেরও রয়েছে আলাদা ‘আঞ্চলিক ভাষা’।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি-তে। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা এলাকায় বসবাস করার কারণে স্পার্ম তিমিদের যোগাযোগের ধরন ধীরে ধীরে বদলে গেছে। ঠিক যেমন মানুষের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষার উচ্চারণে পার্থক্য দেখা যায়।
কীভাবে কথা বলে স্পার্ম তিমি?
স্পার্ম তিমি শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে না। তারা এক ধরনের ছন্দময় ‘ক্লিক’ শব্দের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই নির্দিষ্ট ছন্দের শব্দমালাকেই গবেষকেরা ‘কোডা’ নামে উল্লেখ করেছেন।
একই ধরনের শব্দের ছন্দ ব্যবহার করা তিমিরা সাধারণত একই সামাজিক দলে থাকে এবং একে ওপরকে সহযোগিতা করে।
গবেষণার সহলেখক ও সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুক রেনডেল বলেন, এই শব্দের ধরনই তিমিদের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কীভাবে করা হয়েছে গবেষণা?
গবেষণার জন্য ২০০৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট ১১২ দিন সমুদ্রের নিচে শব্দ রেকর্ড করা হয়। গ্রিসের হেলেনিক ট্রেঞ্চ এবং স্পেনের বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে থাকা স্পার্ম তিমিদের শব্দ বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই অঞ্চলের তিমিই চারটি ক্লিকের ধারাবাহিক শব্দ বেশি ব্যবহার করে। তবে শব্দের গতি ও ছন্দে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চলের তিমিরা প্রথম তিনটি ক্লিক প্রায় সমান বিরতিতে দিয়ে শেষে কিছুটা বিরতি নিয়ে চতুর্থ ক্লিক করে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের তিমিরা একই ধরনের শব্দ তুললেও সেটি অনেক দ্রুত গতিতে উচ্চারণ করে।
তবে গবেষকেরা আরও দেখেছেন, পূর্বাঞ্চলের কিছু তিমি মাঝেমধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের শব্দের ছন্দও ব্যবহার করে।
কেন বদলে গেল শব্দের ধরন?
গবেষকদের ধারণা, স্পার্ম তিমিরা প্রথমে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম অংশে বসতি গড়ে তোলে। পরে ধীরে ধীরে পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ভৌগোলিকভাবে আলাদা থাকার কারণে তাদের যোগাযোগের ধরনও বদলে যায় এবং তৈরি হয় নতুন আঞ্চলিক ভাষা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নতুন ভাষার ধরন তৈরি হতে হলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা থাকা প্রয়োজন। মানুষের ভাষা ও পাখির গানেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
বিলুপ্তির ঝুঁকিতে স্পার্ম তিমি
বর্তমানে ভূমধ্যসাগরের স্পার্ম তিমিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, এই অঞ্চলে এখন মাত্র কয়েক হাজার স্পার্ম তিমি রয়েছে।
ধারণা করা হয়, প্রায় ২০ হাজার বছর আগে তারা ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছিল। এরপর থেকে বিশ্বের অন্যান্য স্পার্ম তিমির তুলনায় তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করছে।
নতুন কী জানাল এই গবেষণা?
গবেষকদের মতে, এই গবেষণা আরও একবার প্রমাণ করল, স্পার্ম তিমির যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের ভাষার অনেক মিল রয়েছে। শুধু জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়, শেখা আচরণ ও সামাজিক সংস্কৃতিও তাদের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিমিদের সমাজে কীভাবে নতুন আঞ্চলিক ভাষা তৈরি হয়, তার অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবেই দেখছেন বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাকে।
আরটিভি/জেএমএ