মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৪৯ পিএম
মুখের চারপাশে সূক্ষ্ম লোম আর বল্লমের মতো কানের ভেতরের অংশ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এক অদ্ভুত অবয়ব। এটি কোনো কাল্পনিক প্রাণী নয়, বরং সম্প্রতি বাংলাদেশে আবিষ্কৃত বিরল প্রজাতির এক বাদুড়। যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট’, তবে গবেষকদের কাছে এটি পরিচিত ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’ হিসেবে।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এই বাদুড়ের সন্ধান মেলায় দেশে শনাক্ত হওয়া বাদুড়ের প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭-এ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক দীর্ঘ সাত বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় এই প্রজাতিটি আমাদের দেশের প্রকৃতির মানচিত্রে যুক্ত করেছেন। গত ৩০ জুন জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘চেকলিস্ট’-এ তাদের এই রোমাঞ্চকর গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একদল গবেষকের এই গল্পটার শুরু ২০১৭ সালের ১৯ আগস্টে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি পুরোনো কালভার্টের নিচে পাথরের খাঁজে অদ্ভুত কিছু বাদুড়ের কলোনি বা আবাসস্থল খুঁজে পান। প্রথম দেখাতেই তাদের মনে কৌতুহল জাগে। সেখান থেকে তিনটি নমুনা সংগ্রহ করে শুরু হয় দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ।
প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করা তো সহজ নয়! তাই গবেষকেরা শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে থেমে থাকেননি। দীর্ঘ সাত বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। ২০২৪ সালের মার্চ ও আগস্ট মাসেও একই স্থান থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বাদুড়টির খুলি ও দাঁতের গঠন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি করা হয় ডিএনএ পরীক্ষা। অবশেষে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি আসলেই পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট বা গোঁফওয়ালা বাদুড়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অনিক সাহা, আশিস কুমার দত্ত, শারমিন আক্তার ও সাজেদা বেগমের এই যৌথ প্রচেষ্টা দেশের বন্য প্রাণীর ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
এই আবিষ্কার বন্য প্রাণী গবেষকদের মাঝে কেন এত আলোড়ন সৃষ্টি করল, তার পেছনে রয়েছে এক ভৌগোলিক বিস্ময়। এত দিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই গোঁফওয়ালা বাদুড় কেবল দক্ষিণ ভারতের কেরালা এবং পশ্চিমঘাট অঞ্চলের ঘন বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। ভারত থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি বনে এর উপস্থিতি বন্য প্রাণীর বিস্তৃতির চেনা ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
শুধু দূরত্বের ব্যবধানই নয়, বিস্ময় রয়েছে এই বাদুড়ের থাকার অভ্যাসেও। ভারতে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে ১ হাজার মিটার বা তারও বেশি উচ্চতার পাহাড়ি এলাকায় এদের দেখা মেলে। অথচ বাংলাদেশে সাতছড়ির চিরসবুজ বনাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৮৫-৮৬ মিটার উচ্চতায় কালভার্টের নিচে এরা দিব্যি সংসার পেতেছে।
গবেষকেরা বলছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে এই বাদুড়টির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বা অভিযোজনক্ষমতা আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। আকারে ছোট থেকে মাঝারি এই বাদুড়টির গায়ের লোম বেশ ঘন ও বাদামি রঙের। কানের ভেতরের ‘ট্রাগাস’ বা মাংসল অংশটি বল্লমের মতো সুচালো, যা কানের দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেক। পুরুষ বাদুড়গুলো বনের মধ্যে সাধারণত একাকী ঘুরে বেড়ায়। তবে বিভিন্ন মৌসুমে কালভার্টের নিচের কলোনিতে এক থেকে ১০টি পর্যন্ত বাদুড়ের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষক আশীষ কুমার দত্ত দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে জানান, এই গোঁফওয়ালা বাদুড় মূলত ‘ইনসেক্টিভোরাস’ বা পতঙ্গভুক। এরা রাতে ওড়ার সময় বিপুল পরিমাণে মশা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় সাবাড় করে। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই বনের ভেতরের এবং আশপাশের এলাকার ক্ষতিকর পোকার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমাদের অজান্তেই এরা পরিবেশের এক বড় উপকার করে চলেছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বৈশ্বিক লালতালিকায় পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটকে ‘তথ্য অপর্যাপ্ত’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, পৃথিবীতে এদের অবস্থা ঠিক কেমন, তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। সাতছড়িতে এদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নিচু পাহাড়ি ও মিশ্র চিরসবুজ বনভূমি এখনো কত শত বিরল বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
তবে এই আনন্দের খবরের পাশাপাশি একধরনের শঙ্কাও উঁকি দিচ্ছে। সাতছড়িতে দিন দিন পর্যটকদের কোলাহল বাড়ছে, বনের পুরোনো কালভার্ট মেরামত করা হচ্ছে কিংবা গাছ কাটা পড়ছে। এতে এই বাদুড়গুলোর আবাসস্থল ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এই গোঁফওয়ালা বাদুড় টিকিয়ে রাখতে হলে বনের পুরোনো কালভার্ট, মৃত গাছের কোটর বা কোণ এবং পরিত্যক্ত ভবনগুলো অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষণ করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ পেলে দেশের প্রকৃতি থেকে এমন আরও অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
আরটিভি/এআর