রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ০৬:১৬ পিএম
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক জান্নাতুল নওরীন উর্মি।
রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেন।
মনোনয়ন সংগ্রহের পর প্রতিক্রিয়ায় নওরীন বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনকে কেবল একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি বাস্তবধর্মী সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। ফলে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২০ শতাংশ। অথচ বিশ্বে গড় প্রতিনিধিত্ব আরও বেশি। এই বাস্তবতায় সংরক্ষিত আসন নারীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
তিনি বলেন, দেশের সামাজিক কাঠামোতে সাধারণ আসনে নির্বাচন করতে যে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োজন, তা তৃণমূলের অনেক নারীর নাগালের বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত আসন নারীদের সংসদীয় রাজনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং নেতৃত্ব বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
এমপি হতে চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নওরীন জানান, দীর্ঘ এক যুগ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে তিনি মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, নারীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, মেক্সিকোতে পারিটি আইন কার্যকর হওয়ার পর মাতৃমৃত্যু কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। অথচ বাংলাদেশে এখনও মাতৃমৃত্যু ও নারীর প্রতি সহিংসতার হার উদ্বেগজনক।
এ ছাড়া তিনি সংসদে নির্বাচিত হলে নারী, শিশু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি ও স্বরাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিগুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, পাশাপাশি নারী অধিকার ও সমঅধিকার নিশ্চিতে প্রাইভেট মেম্বার বিল উত্থাপন এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে ভূমিকা রাখার কথাও জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তরুণ ও নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার উদ্যোগের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব সংসদে নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে তাদের অংশগ্রহণ জরুরি।
সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক রাজনৈতিক পথচলা
নওরীনের রাজনৈতিক জীবন কেবল সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়; রয়েছে কঠিন ব্যক্তিগত সংগ্রামের ইতিহাসও। কলেজ জীবন থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ২০২০ সালের ১ মার্চ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাকালে ভয়াবহ হামলার শিকার হন নওরীন।
ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। পরীক্ষা শেষে হলে ফেরার পথে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী তাকে নির্মমভাবে মারধর করে। এতে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। দলের চেয়ারে স্বয়ং তারেক রহমান তার চিকিৎসার ভার নেন।
ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। পরবর্তীতে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তবে শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি তিনি; এখনও সেই নির্যাতনের চিহ্ন বহন করছেন।
এ ঘটনার পর তার পরিবার মামলা করলেও প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তাকে বহিষ্কার করা হয়, ফলে আর কখনও ক্যাম্পাসে ফিরতে পারেননি তিনি।
কিন্তু তারপরও থেমে যাননি নওরীন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সমানতালে রাজপথের রাজনীতি চালিয়ে যান। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এ কারণে বহুবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি।
প্রত্যাশা: ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণের রাজনীতি
সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান নওরীন। তার মতে, সংরক্ষিত নারী আসন কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং নারীদের মূলধারার নেতৃত্বে পৌঁছানোর একটি সোপান।
সমতা প্রতিষ্ঠার আগে ন্যায্যতার সুযোগ তৈরি করা জরুরি, বলতে গিয়ে তিনি জোর দেন- এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমানভাবে অংশ নিতে পারে।
রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে উঠে আসা এই তরুণ নেত্রী এখন প্রত্যাশা করেন নীতিনির্ধারণের টেবিলে বসে তিনি যেন সেই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর হতে পারেন, যাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও পর্যাপ্তভাবে নিশ্চিত হয়নি।
রাজনীতির পাশাপাশি সমানতালে সমাজসেবা, চলছে পড়াশোনা
নওরীন শুধু রাজনীতিতেই নয়, বরং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মানুষের যে কোনো বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো শিখেছেন ছোটবেলা থেকেই। তবে এর মধ্যে ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাবার, কাপড়, চিকিৎসা সহায়তা এমনকি ক্ষেত্রেভেদে আর্থিক সাহায্য প্রদান তার সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রশংসিত সামাজিক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে একটি।
পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ রেজোনেয়ার’ নামে একটি সংগঠন পরিচালনা করেন নওরীন। যেখানে সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের মানসিক সহায়তা, পরামর্শ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা হয়। প্রয়োজনভেদে হয়রানি শিকার ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ এমনকি আইনি সহায়তাও দেওয়া হয়। আর এ সবকিছু করতে তিনি সারা বছর করা টিউশনি করেন এবং উপার্জিত অর্থ থেকেই তিনি এসব কর্মসূচি পরিচালনা করেন।
দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহায়তায় জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের একাডেমি ফেলোশিপে অংশগ্রহণ করেছেন নওরীন। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ব্রিটিশ ল (ব্যারিস্টারি) পড়ছেন তরুণ এই ছাত্রদল নেতা।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদে বর্তমানে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য এনসিপি নেতা ২৬ বছর বয়সী আবদুল হান্নান মাসউদ। নওরীনের জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র অনুযায়ী, তার বয়স ২৭ বছর। দলীয় সমর্থন পেলে তিনিই হবেন বিএনপির পক্ষে সবচেয়ে কম বয়সী সংসদ সদস্য।
আরটিভি/এমএইচজে